নারী নির্যাতন

সন্তানদের কাছে বোঝা ইশারন নেছা, চান একটু আশ্রয়

ওমেনআই ডেস্ক : পঞ্চগড়ের আটোয়ারী উপজেলার মির্জাপুর ইউনিয়নের বাসিন্দা বৃদ্ধা ইশারন নেছা। বয়স প্রায় ৯৫ বছর। বয়সের ভাড়ে হাঁটতে পারেন না। নিজের চার মেয়ে ও সৎ ছেলেদের সবার কাছেই এখন বোঝা হয়ে উঠেছে ওই বৃদ্ধা। কেউ তাকে আর রাখতে চায় না। নিরুপায় বৃদ্ধা মির্জাপুর উত্তরা বাজারের এক দোকানের সামনে বসে বসে কাঁদছেন। করোনার পরিস্থিতির মধ্যেই সন্তানরা তাকে বের করে দিয়েছেন বাড়ি থেকে। কোনো সন্তানই তাকে দেখভালের দায়িত্ব নিতে রাজি না হওয়ায় বেকায়দায় পড়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরাও।

জানা যায়, ইশারন নেছার স্বামী মজত আলী মারা যায় মুক্তিযুদ্ধের পরপরই। ৫ মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ে মারা গেছেন। বাকি ৪ মেয়েকে বিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন এলাকায়। ৩ মেয়ে স্বামীর বাড়ি মির্জাপুর ইউনিয়নেই। স্বামী মারা যাওয়ার পর বৃদ্ধা তার স্বামীর ভিটায় থাকতেন। সৎ ছেলেদের একজন তাকে দেখভাল করতেন। কিন্তু সেই সন্তানও মারা গেলে। সবকিছু বিক্রি করে একই ইউনিয়নের পাখোরতলা এলাকায় সেজ মেয়ে আজিমা বেগমের বাড়িতে গিয়ে উঠেন ওই বৃদ্ধা। ১৫/১৬ বছর ধরে সেখানেই রয়েছেন। ভিক্ষাবৃত্তি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। গত এক মাস আগে এক মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে গিয়ে পিছলে পড়ে পায়ে আঘাত পান ইশারন। তারপর থেকে হাঁটতে পারেন না। এই অবস্থায় মাকে টানতে না পেরে তার মেয়ে আজিমা তাকে রেখে আসে সৎ ভাই জাহিরুলের বাড়িতে। জাহিরুল ও তার ছেলে সলেমান তাকে ১ মাস দেখাশুনার করার পর তাকে আবার রেখে আসে আজিমার বাড়ি।

কয়েকদিন পর আজিমা আবার রেখে আসে জাহিরুলের বাড়ি। এভাবে এক পর্যায়ে তারা বুধবার সন্ধ্যায় তাদের মাকে ইউনিয়ন পরিষদ চত্বরে রেখে চলে যায়। রাত হলেও তাকে কেউ বাড়িতে নেয়ার উদ্যোগ নেয়নি। রাতে স্থানীয় কয়েকজন যুবক বৃদ্ধার খাবারের ব্যবস্থা করেন। পরে ইউপি চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যরা তার মেয়ে আজিমার বাড়িতে পাঠানোর ব্যবস্থা করেন। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুরে আজিমা আবারও তার মাকে মির্জাপুর উত্তরা বাজারের একটি দোকানের সামনে রেখে চলে যায়। সেখানে বসে বসে কাঁদছেন ওই বৃদ্ধা। সন্ধ্যায় ঝড় বৃষ্টি শুরু হলেও কোনো সন্তানই তাকে ফিরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ নেয়নি।

বৃদ্ধা ইশারন নেছা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমার কেউ নেই। প্রয়োজনে আপনারা আমার স্বামীর ভিটায় একটা ঘর তুলে দিন। আমি সেখানেই যেন মরতে পারি। মেয়ে ও সৎ ছেলে আমাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। কাল সবাই মিলে আমাকে মেয়ে আজিমার বাড়িতে রেখে আসে। আজ আবার আমাকে বাজারে রেখে চলে গেছে। বৃদ্ধার কাছে যেই আসছে তার কাছেই একটু আশ্রয়ের দাবি জানাচ্ছেন।

তার সৎ ছেলে জাহিরুল ইসলাম বলেন, আমি অত্যন্ত দরিদ্র একজন মানুষ। তারপরও ১ মাস আমার বাড়িতে রেখেছিলাম। কিন্তু তিনি বিছানাতেই প্রস্রাব পায়খানা করেন। আমার স্ত্রীও অসুস্থ। তাই তাকে দেখভাল করা সম্ভব হচ্ছে না বলে আজিমার বাড়িতে পাঠিয়ে দেই। এখন তার আপন মেয়েই তাকে আর রাখতে চাইছে না।

বৃদ্ধার মেয়ে আজিমা বেগম বলেন, আমি নিজেই অসুস্থ। তাই মাকে পরিচর্যা করবো কিভাবে। এ ছাড়া আমার মাকে রাখার মতো কোনো ঘর নাই। হাঁটতে পারে না তাই ঘরেই প্রস্রাব পায়খানা করে। আমি খুব কষ্ট করে জীবন যাপন করছি। তাই সৎ ভাইয়ের কাছে রেখে এসেছিলাম।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রহমান বলেন, এই বয়সে বৃদ্ধাকে তার সন্তানরা বের করে দিয়েছেন এটা অমানবিক। তিনি চলাফেরা করতে পারেন না। এই অবস্থায় তার সন্তানরাই পারেন তাকে কাছে রাখতে। বিশেষ করে তার যেই মেয়ের কাছে দীর্ঘদিন ছিলো সেই মেয়ের একটু সদয় হওয়া উচিত। প্রয়োজনে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিসহ আমরা এলাকাবাসীও সহযোগিতা করবো। কিন্তু তার সেবাযত্নের দায়িত্ব তার সন্তানদেরকেই নিতে হবে।

মির্জাপুর ইউনিয়নের ইউপি সদস্য আমিরুল ইসলাম বলেন, ওই বৃদ্ধাকে নিয়ে আমরা বিপাকে পড়ে গেছি। তার নিজের মেয়ে ও সৎ ছেলে কেউ তাকে নিতে রাজি হচ্ছে না। চাল ডাল দিয়ে আমরা গতকাল তার মেয়ে আজিমার বাড়িতে তাকে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ দেখি আবার তাকে বাজারে রেখে গেছে।

মির্জাপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওমর আলী বলেন, ওই বৃদ্ধা তার সবকিছু বিক্রি করে সব টাকা পয়সা নিয়ে মেয়ে আজিমার বাড়িতে উঠেন। ভিক্ষা করে যা পেতেন সব মেয়েকে দিয়ে দিতেন। পায়ে আঘাত পেয়ে এখন ভিক্ষা করতে পারেন না তাই তাকে তার মেয়ে আর রাখতে চাইছে না। আমরা প্রয়োজনে সহযোগিতা করতে পারি কিন্তু দেখভালের দায়িত্ব কিন্তু তো তাদেরই নিতে হবে। ওই বৃদ্ধার সন্তানদের ডেকে বিষয়টির সমাধানের প্রক্রিয়া চলছে বলেও জানান তিনি।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close