আমাদের ওয়েবসাইট www.womeneye24.com আপডেটের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দু:খিত
প্রবাস

নীতি নৈতিকতার কনফারেন্সে একদিন

কাজী সুলতানা শিমি

ইদানীং ভালোবাসা শব্দটার এতো বেশি অপপ্রয়োগ হচ্ছে যে, ভালোবাসা ব্যাপারটা যে আসলে কী তা-ই তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। ভালোবাসার চেয়ে সহিষ্ণুতা ও বিনয় সম্ভবত এখন বেশি দরকার। মূল্যবোধ আর নৈতিকতা না হয় আপাতত অধরাই থাক।

এক শনিবার ওয়েস্টার্ন সিডনি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যারামাটা ক্যাম্পাসে নীতি নৈতিকতা বিষয়ে দিনব্যাপী এক কনফারেন্সে ছিলাম। সকাল ন’টা থেকে রেজিস্ট্রেশন শুরু হলেও পৌছতে পৌছতে দশটাই বেজে গেলো। পার্কিং পেতেও খানিকটা দেরি হয়ে হওয়ায় এই দশা। আগেই নাম নিবন্ধন করা থাকায় নাম সম্বলিত পরিচয় কার্ডটা হাতে ধরিয়ে অডিটরিয়াম দেখিয়ে দিলো ভলান্টরিয়ার মেয়েগুলো। দরজার পাশেই কফি কর্নার। এককাপ কফি নিয়েই ভিতরে গিয়ে বসলাম।

সারা রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে প্রাইমারি স্কুলের নীতিবিদ্যা বিষয়ক শিক্ষক ও নৈতিকতা বিষয়ে আগ্রহী অনেকেই এসেছেন এই কনফারেন্সে। বহুদিন থেকেই এ বিষয়ে আমার আগ্রহ ও পড়াশুনা। তাই আসা।

বিভিন্ন বয়সের ও সংস্কৃতির এই সমাবেশ। মূল বিষয় নীতি-নৈতিকতার বাস্তব প্রয়োগ। প্রয়োগের ক্ষেত্র নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়। বেশিরভাগ অংশগ্রহণকারী নীতি নৈতিকতা বিষয়ক কাজের সাথে কোন না কোনভাবে জড়িত। বেশ বড়সড় থিয়েটার হলে বিশাল পর্দা জুড়ে নানা তথ্য সম্বলিত পাওয়ার প্রেজেন্টে উপস্থাপিত হচ্ছে নীতি-নৈতিকতা বিষয়ক নানা কার্যক্রম। সারাদিনের কর্মসূচি দেয়া আছে।

সম্মিলিত উপস্থাপনার পর আলাদা আলাদা থিয়েটারে ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে প্রোগ্রাম সাজানো। যার যেটাতে আগ্রহ সে সেখানে যাবে। যেখানে বসলাম সেখানে ‘পাবলিক ইন্সট্রাকশান অ্যাক্ট ১৮৮০’ নিয়ে আলোচনা চলছিল। শিক্ষা কার্যক্রম কীভাবে আজ এ অবস্থায় এসেছে তা নিয়ে বিস্তৃত বর্ণনা। জানলাম ধর্মীয় অন্তর্ভুক্তি ছাড়া নৈতিকশিক্ষা আবশ্যিক করার প্রস্তাবে গির্জার পাদ্রীরাই প্রথম বিরোধিতা করেন।

তারপর ধীরে ধীরে ব্যাপারটি স্বাভাবিক পর্যায়ে নিয়ে আসা হয় যে, ধর্মবিশ্বাসের অবমাননা করা ছাড়াও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা সম্ভব। বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী সকলেই যেন নীতিবোধের বিষয়টি অনুধাবন করতে পারে সেটা তার চেষ্টা।

অস্ট্রেলিয়ান প্রাক্তন শিক্ষামন্ত্রী ভ্যারটি ফার্ট জানান, এখন প্রায় ৫০০ স্কুলের ৪৫০০০ শিক্ষার্থী প্রাইমারি স্কুলে নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত হচ্ছে। এ কার্যক্রম স্বেচ্ছাসেবী ভিত্তিতে। এ বিষয়টি খুব উৎসাহমূলক। কেননা এখনও পর্যন্ত ধারণা করা হয় যে ধর্মের বাইরে নৈতিক শিক্ষা দেয়া হলে বুঝি ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করা। ব্যাপারটি কিন্তু তা নয়।

ধর্মীয় বিশ্বাস একটি মানুষের ব্যক্তিগত অনুভূতি। প্রত্যেকে প্রত্যেকের ধর্মকে শ্রেষ্ঠ মনে করে। আর এটাই নানা সংঘর্ষের মূল কারণ। যদি এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিযোগিতায় না নেমে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধকে শেখানো যায় তাহলে এতোটা হানাহানি হয়তো হতো না। আর এ কাজটিই শেখাবে নীতিবিদ্যা। অপরের মতকে গুরত্ব দেয়া। অন্যদের মতামত জানানোর সুযোগ তৈরি করা ও তাকেও প্রাধান্য দেয়া।

কোন সমস্যাকে ভিন্ন দৃষ্টিকোন থেকে উপলব্ধি করার অভ্যাস অনুশীলন করা সুন্দর জীবন যাপনের জন্য খুব প্রয়োজন। শুধু প্রাজ্ঞ, বিজ্ঞ, সুশীল হলেই সমাজ ব্যবস্থা উন্নত হয় না। দরকার গভীর চিন্তাশক্তির অনুশীলন ও প্রয়োগ। দশ বছরের একটি মেয়ে এ কথাগুলোই বলছিল তার প্রেজেন্টেশনে। এই যে দশ বছরের মেয়েটি কথাগুলো জানাল, এসব কোথায় শিখেছে এ প্রশ্নের উত্তরে বললো নৈতিক শিক্ষার ক্লাসে।

প্রশ্নোত্তর পর্বে মেয়েটি নানা প্রশ্নের উত্তরে জানাল জীবন গড়ার পাথেয় হিসেবে পাঠ্যসূচির বাইরে এসব শিক্ষা মনোজগতের বিশালতা বাড়ায়। এসব কথা প্রাচ্যে, বিশেষ করে আমাদের বাংলাদেশে আলাদা করে শেখানো হয় কিনা জানি না। তবে এই শিক্ষার যে সুদুরপ্রসারী গুরত্ব রয়েছে সেটা অনুধাবন করা যায় পাশ্চাত্য সংস্কৃতিতে।

চিন্তার বৈপরিত্যকে মেনে নেয়া এবং তা ইতিবাচক উত্তরণ হিসেবে রূপান্তরিত করার ইচ্ছা এক ধরণের মানবিক গুনাবলী। এই সব গুণাবলী অর্জন খুব সহজ কাজ নয়। এর অনুশীলন থাকতে হবে খুব ছোট বয়স থেকেই। আমরা সেগুলোকে নিয়মতান্ত্রিকভাবে শিক্ষা দেয়ার প্রয়োজন মনে করি না বলেই আমাদের সংস্কৃতিতে এখনো অনেক কিছুই অগ্রহণীয়।

বাস্তব ঘটনাতেই দেখি, কোন অনুষ্ঠানে কারো পারফর্মেন্স চলাকালীন সময়ে কথাবলা বা হৈ চৈ করা যে সুশীল আচরণের মধ্যে পড়ে না সে কথা আমরা আমলেই নিই না। সামাজিক নানা অন্তর্ভুক্তির কারণে অনেক জায়গায় গিয়ে এ ব্যাপারটা বেশ ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছি। অথচ ওয়েস্টার্ন সংস্কৃতির কোন অনুষ্ঠানে সে রকম হয় না বললেই চলে। এছাড়া বেশির ভাগ সময়েই খাবারের লাইনে শৃংখলা ও সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করাটাও আমাদের চরিত্রের অন্তর্ভুক্ত নয়। যা অপেক্ষমাণ অন্যান্যদের জন্য অত্যন্ত অবমাননাকর। এই সব ছোট ছোট বিষয়গুলো খুব ছোট বয়সেই শেখানো হয় বলেই এরা বড় হয়েও সেটা মেনে চলে।

এছাড়াও আছে সময় জ্ঞানের অভাব। অত্যন্ত জরুরি একটা বিষয় হওয়া স্বত্ত্বেও কোথাও তা মেনে চলা হয় না। নির্দিষ্ট সময় দেয়া অনুষ্ঠান অনির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত অপেক্ষার পর যখন শুরু করা হয়, ততক্ষণে দর্শক শ্রোতার বিরক্তির সীমা তুঙ্গে পৌছে। অনুষ্ঠান উপভোগ করা দূরে থাক সমালোচনা ও ফেরার ইচ্ছায় বাকি সময়টুকু কাটানো মাত্র।

অবধারিত সত্যি যে, এখনো অপরের মতামতকে গুরত্ব দিতে শিখিনি আমরা। বিশেষ করে নিজের মতামতের বিরুদ্ধে হলে তো কোন কথাই নেই। অনেক সময়ই বিশাল বাক-বিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ি। সমালোচনা ও নিন্দার পার্থক্য চিন্তা করি না। এমনকি পরিশীলিত শব্দ বা ভাষা ব্যাবহার করার প্রয়োজন মনে করি না। সুন্দর ও মার্জিত শব্দ থাকা স্বত্ত্বেও তা ব্যাবহারের প্রতি গুরুত্ব দিই না। এসবই নৈতিক শিক্ষার বিষয় এবং সংঘর্ষ এড়াতে অত্যন্ত জরুরি।

এছাড়া নৈতিকশিক্ষা যে ধর্মবিশ্বাসের পরিপন্থী নয়, কনফারেন্সে এই ব্যাপারটির অত্যন্ত গ্রহণীয় উপস্থাপন ও বিশ্লেষণ দেখানো হয়। এমন ধরনের সমাবেশ সম্ভবত বর্তমান সময়ে ভীষণ প্রয়োজন।

লেখক:
কাজী সুলতানা শিমি
লেখক এবং কমিউনিটি রিপ্রেজেনটেটিভ
ksultana74@gmail.com , kazi.sultana@my.nd.edu.au

মা/১৫/৯/২১.২২

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close