আমাদের ওয়েবসাইট www.womeneye24.com আপডেটের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দু:খিত
স্বাস্থ্য

চীনা ভ্যাকসিন পরীক্ষার জন্য ছয় হাসপাতাল নির্ধারণ

ওমেনআই ডস্কে : ঢাকার ছয়টি হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চীনা ভ্যাকসিনের ট্রায়াল দেয়া হবে। চলতি মাসেই আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্রের (আইসিডিডিআর,বি) সহযোগিতায় বাংলাদেশে চীনা ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা ট্রায়াল হবে। এই ছয় হাসপাতাল হলো-ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা জেনারেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, কুয়েত মৈত্রী হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল, হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল এবং মহানগর হাসপাতাল।

 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের চীনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের অনুমোদন দিলেও সেটি চূড়ান্ত হবে, তেমন নয়। চীনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের ওপর অনুমোদন চাইলে স্বাস্থ্যবিভাগ অনুমোদন দেয়। রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ভারতসহ আরও ৮টি ভ্যাকসিন চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। তারাও ট্রায়াল করতে চাইলেও স্বাস্থ্যবিভাগ বিবেচনা করবে। তবে বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও চীনের ভ্যাকসিনের দিকে স্বাস্থ্যবিভাগের বেশি নজর। একইসঙ্গে রাশিয়ার ভ্যাকসিন নিয়েও কিছুটা আলোচনা চলছে। সব মিলে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা যেসব ভ্যাকসিনের গুণগতমান ভালো বলবে, সরকার সেই ভ্যাকসিন আমদানি করবে।

 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের গঠিত মিডিয়া সেলের কর্মকর্তা জানায়, ঢাকার হাসপাতালে করোনা আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বেশি। চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী করোনা রোগীর চিকিৎসা দিতে গিয়ে নিয়মিত করোনা আক্রান্ত হচ্ছেন। এজন্য ঢাকার ছয়টি হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের করোনাভাইরাস প্রতিরোধে চীনা ভ্যাকসিন ট্রায়ালের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এই ট্রায়াল কবে থেকে হবে তা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে চলতি মাসে ভ্যাকসিনের ট্রায়াল শুরু হবে এটি প্রায় নিশ্চিত।

 

জানা যায়, চীনের তৈরি ভ্যাকসিন বাংলাদেশ অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পাবে। আবার প্রতিবেশী ভারতও ভ্যাকসিনের বিষয়ে বাংলাদেশকে আশ্বস্ত করেছে। সম্প্রতি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব হর্ষবর্ধন শ্রিংলা বাংলাদেশ সফরে এসে এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে আশ্বস্ত করেন। এই দুই দেশের বাইরে বাংলাদেশ ভ্যাকসিনের বিষয়ে আরও তিনটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তবে ভ্যাকসিন প্রাপ্তির বিষয়ে অগ্রগতি কতটুকু সে বিষয়ে স্বাস্থ্য বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে এখনও কিছু জানায়নি। সাধারণত ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো ভ্যাকসিন প্রাপ্তিতে অগ্রাধিকার পায়।

 

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনার মরণ ছোবলে দেশের আর্থসামাজিক, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, উৎপাদন, শিল্প-সংস্কৃতি সবকিছুই মহাসংকটে পড়েছে। করোনা আক্রান্ত ও মানুষের মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। এই মরণ ছোবল ও মহাসংকট থেকে উত্তোরণের একমাত্র উপায় ভ্যাকসিন গ্রহণ। এজন্য বিশ্ব অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ভ্যাকসিনের সফল আবিষ্কারের জন্য। তবে ইতোমধ্যেই ভ্যাকসিন নিয়ে দ্বিধা, দোলাচল, অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে। এ জন্য ভারত, চীন নাকি রাশিয়ার ভ্যাকসিন বাংলাদেশে চূড়ান্তভাবে অনুমোদন পাবে সেটি এখন পর্যন্ত বলা যাচ্ছে না।

 

চলতি বছরের শুরুতেই চীনে করোনা আক্রান্তের খবর পাওয়া যায়। ভাইরাসটি বিশ্বে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় অনেক দেশ করোনা প্রতিষেধক আবিষ্কারে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় অবশ্য করোনাভাইরাসের সম্ভাব্য ভ্যাকসিনের শেষ ধাপের পরীক্ষা শুরু করেছে বলে ব্রিটিশ ওষুধ প্রস্তুতকারক কোম্পানি অ্যাস্ট্রাজেনেকা জানায়। অন্যদিকে রাশিয়া, চীন, আমেরিকা আর ইংল্যান্ড করোনা ভ্যাকসিন পরীক্ষাও শেষ ধাপে রয়েছে। বিশ্ব করোনা ভ্যাকসিনের পেছনে দ্রুত গতিতে ছুটে চললেও এখন পর্যন্ত কার্যকরী ভ্যাকসিন আবিষ্কার করতে পারেনি। কবে নাগাদ করোনার ভ্যাকসিন আবিষ্কার হবে, সুনির্দিষ্ট তথ্য জানা যাচ্ছে না। তাই একটি শুভক্ষণের আশায় পুরো বিশ্ব অনেকটা উদগ্রীব।

 

বাংলাদেশ কোন দেশ থেকে করোনা ভ্যাকসিন নেবে সেটিও অস্পষ্ট রয়ে গেছে। সম্প্রতি স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক স্বপন বলেন, যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের তৈরি ভ্যাকসিন পাওয়ার প্রতিশ্রুতি বাংলাদেশ পেয়েছে। অন্যদিকে রাশিয়া বাংলাদেশের ভ্যাকসিন উৎপাদনের সক্ষমতা জানতে চাইলে স্বাস্থ্যমন্ত্রী রাশিয়ায় চিঠি পাঠিয়েছেন। রাশিয়া জিটুজি পদ্ধতিতে (সরকার থেকে সরকার) করোনার ভ্যাকসিন দিতে চায়। রাশিয়ার পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যদি ভ্যাকসিন তৈরি করার সুযোগ থাকে তাহলে তারা এদেশেও ভ্যাকসিন তৈরির জন্য অনুমোদন দিতে পারে। এছাড়া ভারতের সেরাম ইনস্টিটিউটের সঙ্গে বাংলাদেশের বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেডের চুক্তি হয়েছে। সব মিলে বাংলাদেশে কোন দেশের ভ্যাকসিন চূড়ান্ত হবে সেটি এখনও অধরাই রয়ে গেছে।

 

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, ভ্যাকসিন নিয়ে সরকারের অবস্থান স্পষ্ট। গত তিন মাস থেকেই ভ্যাকসিন নিয়ে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে। ভ্যাকসিন প্রাপ্তির বিষয়ে এই সংস্থা থেকে আমাদের আশ্বস্তও করা হয়েছে। যে দেশ বিশ্ববাজারে ভ্যাকসিন নিয়ে আসবে তাদের বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার অনুমোদন নিতে হবে। এছাড়া বাংলাদেশ গ্লোবাল ভ্যাকসিন ইমিউনাইজেশনের (গ্যাভি) অন্যতম সদস্যও। সুতরাং দেশে করোনার ভ্যাকসিন ট্রায়াল করা না করায় নিয়ে টিকা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে কোন সমস্যা হবে না।

 

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ ভ্যাকসিন প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে। ভ্যাকসিন পেতে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, রাশিয়া, ভারত ও চীনের সঙ্গে সরকার আলোচনা শুরু করেছে। এর বাইরে কয়েকটি দেশি ওষুধ কোম্পানিও ভ্যাকসিন উৎপাদনকারী কয়েকটি দেশের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, যাতে ভ্যাকসিন উৎপাদন শুরু হলে কাঁচামাল বা ফর্মুলা এনে দেশি কোম্পানিগুলো উৎপাদনে যেতে পারে। এটি হলে দেশি কোম্পানিগুলোর মাধ্যমে ভ্যাকসিন উৎপাদন করে দ্রুততম সময়ে মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হবে। সরকারও এই প্রক্রিয়াকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

 

স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক (ডিজি) ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, হাসপাতালের চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর উপর চীনা ভ্যাকসিন ট্রায়াল দেয়া হবে। স্বেচ্ছায় যারা ভ্যাকসিন নিতে চাইবেন শুধু তাদের দেয়া হবে। এই দায়িত্ব পালন করবে আইসিডিডিআর,বি।

 

বাংলাদেশে করোনার ভ্যাকসিন আমদানির বিষয়ে বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমএ) মহাসচিব ডা. ইহতেশামুল হক চৌধুরী দুলাল বলেন, করোনার ভ্যাকসিন নিয়ে কূটনীতি হবে, রাজনীতি হবে। ভ্যাকসিনের বিষয়টি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেই দেখতে পারেন। ভ্যাকসিনে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য অধিদফতর অব্যবস্থাপনা করতে পারবে না। রাশিয়া, চীন ও ভারতের সঙ্গে ভ্যাকসিন নিয়ে বাংলাদেশ আলোচনা করছে, এটি ভালো দিক। কারণ একক কোন রাষ্ট্রের সঙ্গে ভ্যাকসিন আমদানি নির্ভর থাকছে না। আমার মনে হচ্ছে, কয়েক দেশ থেকে বাংলাদেশে ভ্যাকসিন আসবে। এক দেশ থেকে করোনা ভ্যাকসিন এলে ১৬ কোটি মানুষকে দেয়া সম্ভব নয়।

 

কোভিড-১৯ বিষয়ক জাতীয় কারিগরি পরামর্শক কমিটির আহ্বায়ক ও বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যান্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) সভাপতি অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ বলেন, যে দেশের করোনা ভ্যাকসিন কার্যকর হিসেবে বাজারে আসবে তাদের ভ্যাকসিন বাংলাদেশ নেবে। আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে ভ্যাকসিনের বিষয়ে কোন কিছু হবে না। সেজন্য বাংলাদেশ সরকারও নজর রাখছে, বিশ্বে যেসব ভ্যাকসিন ট্রায়াল হচ্ছে, সেগুলোর মধ্যে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা যেসব ভ্যাকসিন সমর্থন দেবে সরকার সেটি নেবে। অক্সফোর্ডের ভ্যাকসিন, চীনা ভ্যাকসিনসহ অন্যান্য ভ্যাকসিনের ব্যাপারে সরকার নজরে রাখছে।

 

তিনি আরও বলেন, ভ্যাকসিন আন্তর্জাতিক বাজারে এলে কিভাবে প্রথমেই বাংলাদেশে আসবে, সে বিষয়ে সরকার পরিকল্পনা করেছে। কিভাবে মানুষের মাঝে ভ্যাকসিন দেয়া হবে সেটিও চূড়ান্ত হয়েছে। সেখানে প্রথমে ভ্যাকসিন পাবেন চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী। দ্বিতীয় ধাপে বয়স্ক মানুষ। এভাবে ধাপে ধাপে এগোনো হবে।

 

আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে, বিশ্বজুড়ে ২০২টি ভ্যাকসিন নিয়ে কাজ হচ্ছে। তবে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, ২৭টি ভ্যাকসিন পরীক্ষামূলক প্রয়োগের পর্যায়ে রয়েছে। এরমধ্যে রাশিয়া প্রথম ভ্যাকসিন উৎপাদনের ঘোষণা দিয়েছে। তবে ওই ভ্যাকসিন নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে, এমনকি দেশটির অভ্যন্তরেও নানা বিতর্ক রয়েছে। এর বাইরে ভ্যাকসিন তৈরির কাজে সবার চেয়ে এগিয়ে আছে যুক্তরাজ্য, চীন ও যুক্তরাষ্ট্র। তিন দেশের ভ্যাকসিনই পরীক্ষামূলক প্রয়োগের তৃতীয় পর্যায়ে আছে। ভ্যাকসিন প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সময় সংক্ষেপ করে নিজ নিজ ভ্যাকসিন বাজারে আনতে চাইছে। এর মধ্যেই চীনের ভ্যাকসিনের পেটেন্ট করার অনুমোদন দিয়েছে বেইজিং। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা ভ্যাকসিন উদ্ভাবক কোম্পানিগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close