আমাদের ওয়েবসাইট www.womeneye24.com আপডেটের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দু:খিত
মতামত

নিষিদ্ধ নারী! তিনি থাকলে নারী জাগরণ তরান্বিত হতো

মজিব রহমান
আমাদের পুরুষরা দাসী ভোগ করবে, হোটেল গিয়ে নারী সান্নিধ্য নিবে, পতিতালয়ে গিয়ে সেক্স করবে তাতে কারো কোন আপত্তি নেই। কোন নারীর যদি প্রকাশ্যে হাঁটতে গিয়ে ওড়না খসে যায় তবেই সর্বনাশ! এমন জাতীয় চেতনার ভিত্তিমূলেই আঘাত করতে পেরেছিলেন তসলিমা নাসরিন। তাঁর আত্মজীবনীমূলক সবগুলো বই নিষিদ্ধ করে, নিজ জন্মভূমিতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে তাকে নিষিদ্ধ নারী করে দিয়েছে আমাদের মৌলবাদী পুরুষতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ। তিনি দেশে থাকলে নারী জাগরণ তরান্বিত হতো। তাঁর লেখায় উঠে আসতো নারীদের পেছনে ঠেলে দেয়ার বিষয়গুলো। তাকে দূরে রাখায় আমাদের ক্ষতি কম হয়নি।
বাঙালি নারী জাগরণের প্রাথমিক অগ্রদূত যদি বেগম রোকেয়া হন তবে আধুনিক অগ্রদূত অবশ্যই তসলিমা নাসরিন। রোকেয়া নারীদের শিক্ষার কথা বললে তসলিমা বলতেন মুক্তির কথা। মৌলবাদী মূর্খ মোল্লাদের মতো কিছু কথিত প্রগতিশীল লেখকও তসলিমাকে হনন করতে চায়, লাঞ্ছিত করতে চায়। সরাসরি না লিখলেও বুঝতে কারোই অসুবিধা হয় না, তারা কাকে বিধতে চান। আমাদের বহু পুরুষ লেখকের অনাচারের কথা জানি। শরৎবাবু পতিতাগমন করে মহৎ হয়েছেন, রুদ্র মোহাম্মদ শহিদুল্লাহ সিফিলিসে আক্রান্ত হয়ে মহৎ হয়েছেন, হুমায়ূন আহমেদ কিশোরী বিয়ে করে মহৎ হয়েছেন, রবীন্দ্রনাথ শিশুকন্যাদের বিয়ে দিয়ে মহৎ হয়েছেন, নজরুল নববধূকে ফেলে পালিয়ে গিয়ে মহৎ হয়েছেন। আজও প্রতারণা-বাটপারির অভিযোগ অনেক লেখকের বিরুদ্ধে রয়েছে। অথচ সৈয়দ হক সহ কয়েকজের তসলিমার সাথে যৌনতা করার খায়েসকে প্রকাশ করায় চরিত্রহীন হয়েছেন তসলিমা। একজন মেধাবী তসলিমা সহজেই সুখে সাচ্ছন্দে জীবন কাটাতে পারতেন। অর্থহীন লেখক হয়ে, ডাক্তারি করে বাহবা কুড়াতে পারতেন। সেই সুখে থাকার পথে হাঁটেননি আজন্ম সংগ্রামী তসলিমা নাসরিন। তিনিই আমাদের নারীদের সাহসী করে তুলছিলেন, স্বাধীন করে তুলছিলেন, ব্যক্তিত্ববতী করে তুলছিলেন। আজ যে নারীরা সচিব হচ্ছেন, সংগ্রাম করছেন তাঁর প্রেরণা এসেছে তসলিমার কাছ থেকেও। তিনি দেশে থাকতে পারলে নারীরা আরো গতিশীল, আরো অগ্রসর হতে পারতেন। কিছু পুরুষ তাঁকে ঘৃণার চোখে দেখবে, কিছু মানুষ আবার তাঁকে শ্রদ্ধার চোখেও দেখবে। দেশে না থাকলেও বহু নারী এবং কিছু পুরুষ তাঁকে হৃদয়ে ও চেতনায় ধারণ করে।
তিনি একজন বাংলাদেশি হিসাবে ১৯৯২ ও ২০০০ সালে দুবার আনন্দ সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছে, ইউরোপিয়ান পার্লামেন্ট কর্তৃক শাখারভ পুরস্কার পেয়েছেন, ফান্স সরকার প্রদত্ত মানবাধিকার পুরস্কার পেয়েছেন, ফ্রান্সের এডিক্ট অব নান্তেস পুরস্কার পেয়েছেন, সুইডিশ ইন্টারন্যাশনাল পেন কর্তৃক কার্ট টুকোলস্কি পুরস্কার পেয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস ওয়াচ কর্তৃক হেলম্যান-হ্যামেট গ্রান্ট সম্মাননা পেয়েছেন, নরওয়েভিত্তিক হিউম্যান-এটিস্ক ফরবান্ড কর্তৃক মানবতাবাদী পুরস্কার পেয়েছেন। গর্বে আপনার বুক ভরে উঠছে তো। কিন্তু যখনই শুনবেন এগুলো তসলিমা নাসরিন পেয়েছেন তখন যদি উল্টো আপনার ঘৃণায় ভ্রু কুঞ্চিত হয় তবে নিশ্চিত হোন, আপনিই মৌলবাদী, ধর্মান্ধ, প্রতিক্রিয়াশীল কাপুরুষ। আরো শুনুন, তসলিমা নাসরিনের জীবনভিত্তিক প্রথম চলচ্চিত্র ‘নির্বাসিত’ ২০১৪ সালে মুম্বাই চলচ্চিত্র উৎসবে মুক্তি পেয়ে শ্রেষ্ঠ বাংলা চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করে।
তসলিমা প্রথম আলোচনায় আসেন নির্বাচিত কলাম লিখে। মানুষের বিশেষ করে নারীদের নজরে আসে তাঁর কবিতা ও উপন্যাস। তাঁর ৭টি আত্মজীবনী গ্রন’ই আসলে কাঁপিয়ে দেয় পুরো বাংলাদেশ ও ভারত। মূলত আমার মেয়েবেলা, উতাল হাওয়া এবং ক নামের প্রথম তিনটি আত্মজীবনী গ্রন্থ বিপুল আলোচিত হয়। মৌলবাদীরা বিপুল সমালোচনা করে তার মুণ্ডুপাত করে। অবশ্য এ গ্রন্থগুলো প্রকাশের আগেই মৌলবাদীদের ফাঁসির দাবী ও হুমকীর মুখে তিনি দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। এরপর কখনো সুইডেন, জার্মানি, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এবং প্রধানত ভারতে বসবাস করে আসছেন।
ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজে তাঁর কিছুটা জুনিয়র ছিলেন আমার স্ত্রীর বড় ভাই ডাক্তার আশরাফুল আলম। তিনিও সাহিত্যানুরাগী ছিলেন। তাঁর মুখেই প্রথম তসলিমার নাম শুনি। তিনি অনুমান করেছিলেন, এই নামটি বহুকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবে, বহুদিন শুনতে হবে। তসলিমা দেশের নারীদের একটি আশ্রয় হয়ে উঠেছিলেন। বহু নারীই প্রতিবাদ করতে শিখেছিলেন তাঁর কলাম পড়ে। নারীদের জীবনবোধ পাল্টে যাচ্ছিল। আমি বহু নারীর কাছেই শুনেছি, তাদের প্রিয় লেখক তসলিমা নাসরিন। শুধু মৌলবাদীরাই নয়, পুরুষতন্ত্রও তাঁকে দেশে থাকতে দিতে চায়নি। তবে যাই হোক তসলিমাকে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হলেও, তিনি দেশের নারীদের মনে যে নাড়া দিয়ে গেছেন তা থেমে যাওয়ার নয়। তিনিও কালজয়ী আধুনিক নারী জাগরণের অগ্রদূতই হবেন।২৬ আগষ্ট,২০২০

ফেসবুক থেকে

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close