আমাদের ওয়েবসাইট www.womeneye24.com আপডেটের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দু:খিত
মতামত

পুলিশের জন্ম কিছু সেনাসদস্য ও রাজকর্মচারীর সমন্বয়ে!

সোহেল সানি
রাজার কতিপয় রাজকর্মচারী ও রাজ্যরক্ষাকারী সেনাবাহিনীর কর্মচারীদের একাংশের সমন্বয়ে পৃথিবীতে পুলিশের জন্ম ১৭১৪ সালে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী হয়ে ওঠার ঘটনা সে-তো পরের ইতিহাস।

পুলিশের উদ্ভাবক স্কটল্যান্ড। ভারত উপমহাদেশে বাংলা প্রদেশ হলো, পুলিশ পদ্ধতি প্রবর্তনকারী প্রথম রাজ্য। ১৮৭২ সালে ব্রিটিশ সম্রাজ্ঞী রানী ভিক্টোরিয়া এর প্রবক্তা। তিনি ভারত রাজত্বের ১৫ বছরের মাথায় গভর্নর লর্ড কর্নওয়ালিশকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যায় পুলিশ পদ্ধতি প্রবর্তনের নির্দেশ দেন। মূলত প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায় করাই ছিল পুলিশের কাজ।

পরে ভারতের আট প্রদেশেই পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলা হয়। পুলিশ বাহিনী প্রধানকে এখন আইজিপি বলা হলেও প্রতিষ্ঠালগ্নে ‘কমিশনার’ বলা হতো। ১৭১৪ সালে স্কটল্যান্ডের রাজা “স্কটল্যান্ড কমিশনার অব পুলিশ” পদ সৃষ্টি করেন।এই আদেশ বিধির মধ্যেই ছিল বাহিনী গঠনের রূপরেখা। কালক্রমে দেশে দেশে এর ব্যাপ্তি ও বিস্তৃতিলাভ করে। সৃষ্টি হয় বিভিন্ন পদের।

গ্রীক শব্দ Polis থেকে Police শব্দটি উদ্ভূত। শব্দার্থে অসামরিক বা বেসরকারী সংস্থা। এখন পুলিশ সংবিধিবদ্ধ সরকারি সংস্থা।
‘খৃষ্টপূর্ব ৬৩ সালে রোম সম্রাট অগাষ্টাস ও ফ্রান্সের পঞ্চম চার্লস তাদের রাজত্বকালে পুলিশ বাহিনীর প্রবর্তন করেন।

১৮৭২ সালের ৭ ডিসেম্বর “Regulations for the Police of the Collectorships in Bangla, Behar and Orissa” আইন পাশ করা হয় বৃটেনের পার্লামেন্টে।

পুলিশ জেলা কালেক্টরের অধীন পরিচালিত হতো। মহৎ উদ্দেশ্যে নয়, বরং বৃটেনের সমৃদ্ধির জন্যই এদেশীয় প্রজাদের কাছ থেকে খাজনা আদায়ের বলপ্রয়োগের জন্য পুলিশি ব্যবস্থা।
ইংরেজ নিযুক্ত কালেক্টররা প্রজা বিদ্রোহ দমনের হাতিয়ার হিসেবেও পুলিশকে ব্যবহার করতো।পরে কালেক্টরদের বিচারিক ক্ষমতাও দেয়া হলো। ম্যাজিস্ট্রেট ম্যাজিস্ট্রেসি ক্ষমতা পেলো জেলা কালেক্টররা। নামে এক হলেও লক্ষ্য উদ্দেশ্যে বৃটেন পুলিশ ও ভারতীয় পুলিশ এক ছিলো না।

যে কারণে এ দেশীয় পুলিশি ব্যবস্থার নেতিবাচক প্রভাব আজও বিরাজমান। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশরা ভারত ত্যাগ করলেও রয়ে গেছে তাদের রেখে যাওয়া আইন-কানুন।১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে পুলিশ বাহিনী মুক্তিবাহিনীতে একাট্টা হলেও স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশে পুলিশ জনগণের আস্থা সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়। সরকারগুলোও পেটোয়া বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করে। প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন ঘটলেও মন-মানসিকতায় রাজতান্ত্রিকতার প্রভাব রয়ে যায়।

আদি সাম্যবাদী সমাজের পুলিশ ও বর্তমান পুলিশ এক নয় । না কর্মে, না রূপে, না স্বভাবে, না আচার আচরণে। এই প্রভাবের মূল কারণ জন্মসূত্র।

রাজার রাজস্ব সংগ্রহকারী রাজকর্মচারী এবং রাজ্য রক্ষায় নিয়োজিত সৈন্য বাহিনীর কর্মচারীদের একাংশ থেকে পুলিশের সৃষ্টি। যখন ছিলো মানুষ অরণ্যচারী। ছিলো কেবল আহারের তাড়নায় যথেচ্ছা ভবঘুরে। সমাজ বা রাষ্ট্র তখনো গড়ে ওঠেনি। মানুষ যখন খাদ্য ও অন্যান্য দ্রব্যাদি প্রয়োজনের অধিক উৎপাদন করলো, তখনি ভবিষ্যতের জন্য মজুতের সুযোগ হাতিয়ে নিতে চাইলো। আর এভাবেই উদ্ভব ঘটলো একটা শোষক শ্রেনীর। সবলের দ্বারা দুর্বল আঘাত প্রাপ্ত হতে থাকলো। শুরু হলো ভূমিদখল ফসল ও সম্পত্তিহরণ। শোষণের যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকলো সাধারণ মানুষ।

ব্যক্তিগত সম্পত্তি রক্ষায় সমাজের মধ্যে কতগুলো বিধিনিষেধ আরোপিত হয়।
আইনসভার মাধ্যমে কতিপয় আইন পাশ তা প্রয়োগ ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব অর্পিত হলো পুলিশের ওপর। কিন্তু পুলিশ সম্পর্কে জনমনে বিরাজমান ভ্রান্ত ধারণার প্রতিকার সম্ভব হলো না। জনগণ ও পুলিশের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক একটা কল্পনা প্রসূত ব্যপার হয়েই থাকলো। পুলিশের কয়েকজন সাবেক আইজিপি’র মতে, পুলিশের বিরূপ ভাবমূর্তির নেপথ্যে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহল ও তাদের দলীয় অপরাধীদের অনুকূলে অবস্থানও অনেকটা দায়ী। আর সাক্ষীদের দুর্ভোগ তো আছেই।
পুলিশ সরকারের প্রতিনিধি মাত্র। আর সরকার হচ্ছে রাষ্ট্রের অংশ। রাষ্ট্র হচ্ছে জনগণের কাছ থেকে ক্ষমতাপ্রাপ্ত এক সমাজ ব্যবস্থা ।
‘পুলিশ আইন ১৮৬১’ এর ২৩ ধারায় পুলিশের কর্তব্য সম্পর্কে বলা হয়েছে, সর্বসাধারণের শান্তি রক্ষা সম্পর্কিত তথ্য সংগ্রহকরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অবহিতকরণ। কোন অপরাধ সংঘটন বা এরূপ আশঙ্কা দেখা দিলে অপরাধ প্রতিরোধ বা নিবারণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ অপরাধের প্রকৃত রহস্য উদ্ঘাটন করা। আইনসঙ্গতভাবে গ্রেফতারযোগ্য ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা। অপরাধীকে গ্রেফতারের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে আদালতে সোপর্দ করা। সর্বসাধারণের বিরক্তি উদ্রেককর কার্য অর্থাৎ পাবলিক ন্যুইসেন্স নিবারণ করা।
১৪১ নং বিধি মোতাবেক পুলিশ গ্রেফতারের ক্ষেত্রে যা করবেনঃ ফৌজদারী আইনের ৫৭ (১) ধারা অনুযায়ী গ্রেফতার বৈধ হতে হবে। ১৮৬১ সালের ৩২ ধারা অনুযায়ী তা আমলযোগ্য অপরাধ হতে হবে। কোন ম্যাজিস্টেটের উপস্থিতিতে ফৌজদারি কার্যবিধি ৬৪ ধারার অধীনে আটকাদেশ জারি করতে হবে। ২০৮ নং বিধি মোতাবেক থানার কনস্টেবলদেরকে গ্রেফতারী পরোয়ানা কার্যকরীকরণ, এসকর্ট ও পাহারাদার, বিপজ্জনক পথসমুহ ও অন্যান্য এলাকার পাহারাদানের দায়িত্বে নিয়োগ করা যেতে পারে। উদ্বর্তন কর্মকর্তার আদেশক্রমে দাঙ্গা ও গোলযোগ দমনের জন্য ও তাদের নিয়োগ করা যাবে। এ ছাড়াও
এজাহার গ্রহণ, লিপিবদ্ধকরণ, তল্লাশি পরিচালনা, সন্দেহভাজন ব্যক্তি সনাক্তকরণ পুলিশের দায়িত্ব। বাংলাদেশ পুলিশের আধুনিকায়নে বহু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে দ্বিতীয় শ্রেণির মর্যাদা থেকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা হয়েছে বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে। পুলিশের ব্যবহৃত প্রযুক্তি কৌশল পাল্টেছে। ফটোগ্রাফি, লাই ডিরেক্টর, অস্ত্র পরীক্ষা, বর্ণালী বিশ্লেষণ পদ্ধতি, মাইক্রোস্কোপের ব্যবহার, রাসায়নিক বিশ্লেষণ ও রক্তপরীক্ষা ও ক্যাস্টি পদ্ধতি,আঙ্গুল ছাপ প্রভৃতি পুলিশ বাহিনীকে অনেক আধুনিক করেছে। প্রত্যেকটি বিভাগের নামের সঙ্গে যুক্ত করে গড়ে তোলা হয়েছে মেট্রোপলিটন পুলিশ। মেট্রোপলিটন পুলিশ হলো ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল, সিলেট, কুমিল্লা, রংপুর।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট

সা/২৫/৮/১১.২৪

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close