আমাদের ওয়েবসাইট www.womeneye24.com আপডেটের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দু:খিত
আপন ভুবন

আমার নিজস্ব জগত

শান্তা মারিয়া
মনে হয় অনেকবারই একথাটি বলেছি যে, আমার নিজস্ব জগতে আমি ছিলাম এবং আছি একান্ত একা।কিন্তু এই একাকীত্ব এতই অভ্যাস হয়ে গেছে অথবা আমার মনের গঠনটাই এমন যে একা থাকতে আমার খারাপ কখনও লাগেনি। এখনও লাগে না। আমার এমন কোন বন্ধু সারাজীবনে হয়নি যার সঙ্গে আমার সুখ-দুঃখের সমস্ত কথা ভাগ করে নিতে পারি। আমার দুই তিনজন খুব ভালো বন্ধু অবশ্যই আছেন। যারা আমাকে অনেক ভালোবাসেন। কিন্তু তাদের কাছেও আমি কেন যেন একেবারে সমস্ত কথা কখনও উজার করে বলতে পারি না। আমার সবচেয়ে ঘনিষ্ট বন্ধু নুসরাত স্বাতী। যার সঙ্গে পাঁচ বছর বয়স থেকে বন্ধুত্ব। সেই বন্ধুত্ব এখনও আছে ভালোভাবেই। তারপরও, এমনকি তারসঙ্গেও কোথায় যেন একটা সীমান্ত আছেই। হয়তো জন্মলগ্ন থেকেই আমি রবিনসন ক্রুশো।
বাবা, মা, ভাই ও আমি এই চারজনের পরিবারে বেড়ে ওঠা। ভাই আমার চেয়ে আট বছরের বড়। খুব ছোট্ট বেলায় অপেক্ষায় থাকতাম ভাই কখন স্কুল থেকে ফিরবে। তার স্কুলের গল্পগুলো হা করে শুনতাম। সে আর কতক্ষণ! ভাইয়ার টিচার আসতেন তাকে পড়াতে। তার স্কুলের হোমওয়ার্ক, তার নিজস্ব বন্ধুবান্ধব। এরমধ্যে আমার জন্য আর সময় কতটুকু?
সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর সারাদিন আমার সামনে অজস্র সময়। সেই সময়ের প্রধানতম বন্ধু ছিলেন অবশ্যই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। বস্তুত তিনি আমার বন্ধু জন্মের আগে থেকেই। মায়ের ছিল কবিতা রোগ। তিনি সঞ্চয়িতা থেকে আবৃত্তি করতেন। রবীন্দ্রনাথের ভীষণ ভক্ত ছিলেন। মাতৃগর্ভ থেকেই তাই আমি কবিতা শুনছি। ছোটবেলায় কবিতা বলে বলে কানের পোকা নড়িয়ে দিয়েছিলেন মা। ফলে মাথার ভিতরে একেবারে ছাপ মেরে গিয়েছিল শিশু, কথা কাহিনী, বলাকার কবিতা। সেজন্যই যখন তখন কবিতা মুখস্ত বলতাম। অর্থ টর্থ না বুঝেই তোতা পাখির মতো। পড়তে শেখার আগ পর্যন্ত রবীন্দ্রনাথের কবিতাগুলো মুখে বলতে বলতে শব্দ নিয়ে খেলার অভ্যাস হয়েছিল। আপনমনে কথা বলতাম। বাবা একদিন খেয়াল করলেন আমি যা বলছি তা রবীন্দ্রনাথের কবিতা নয়, নিজস্ব কিছু। প্রথম উচ্চারিত কবিতাটি ছিল
‘ধরণী তলে মাথাটি থুয়ে
জাগায়ে তুমি দিয়েছ প্রাণ
আমি ভালোবাসি
সবচেয়ে গান’
তখন আমার তিন বছর বয়স। শুনলেই বোঝা যায় শব্দগুলো রবীন্দ্রনাথেরই কবিতা থেকে জন্মেছে। তবু তার মধ্যেও অন্যরকম নিশ্চয়ই কিছু ছিল।
যা হোক, বাবা তো অফিসে চলে যেতেন, ভাই স্কুলে। মা হয়তো ঘরের কাজকর্মে অথবা উল্টোরথ পড়ায় ব্যস্ত। আমি একা একা আমাদের ছোট বাগানে ঘুরে বেড়াতাম। হয়তো সোনার তরী কিংবা নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ বলছি আর বাগানে ঘুরছি। দুটো পেয়ারা গাছ ছিল। একটা আমগাছ। একটা আতা গাছ। হাসনাহেনা ফুলের ঝাড়। একটা নারিকেল গাছ। একটা জবাগাছ। বিশাল একটা গোলাপ গাছ। অতবড় গোলাপ গাছ আমি আর কোথাও কখনও দেখিনি। রীতিমত কাঠের কান্ড, শক্ত ডালপালা মেলা গাছ। তাতে অজস্র গোলাপ ফুটে থাকতো। হালকা গোলাপি রংয়ের ছোট ছোট গোলাপ। মন ভরানো সৌরভ। বাড়ির বাইরে যাওয়া নিষেধ ছিল। তাই টিনের গেটের ফাঁক দিয়ে দেখতাম গলির মধ্যে বস্তির ছেলেমেয়েরা খেলছে। মা হাঁস, মুরগি পালতেন। কাঁচা উঠোনের একদিকে জাল দিয়ে ঘেরাও করা বড় খাঁচা। তারমধ্যে ছোট একটা কাঠের ঘর। সেখানে রাত হলে মুরগিরা থাকে। মোট ৪৬টা মুরগি ছিল। কয়েকটা চীনা ও দেশী হাঁস ছিল। আমি সবগুলো মোরগ মুরগির নাম দিয়েছিলাম। এগুলোর বেশিরভাগই ছিল তেজগাঁওর সরকারি ফার্ম থেকে আনা একদিনের মুরগির বাচ্চা। কালো রঙের ব্ল্যাক মোনার্ক, সাদা লেগহর্ন আর লাল রোডস আইল্যান্ড রেডস জাতের। দেশীও ছিল দু একটা। চারটা ব্ল্যাক মোনার্কের নাম ছিল রাম, লক্ষণ, ভরত, শত্রুঘ্ন। এই নামগুলো আমি দিয়েছিলাম। তখন বোধহয় আমার ছয়-সাত বছর। মাত্র ছেলেদের রামায়ণ পড়ছি। লাল একটা দেশী মোরগের নাম লালমিয়া। সাদা মোরগের নাম ধলু, মিশকা, স্তেপান। একটি ছিল বেশ লড়াকু। তার নাম ফাইটার। মুরগিদের মধ্যে কয়েকটির নাম সিলভি, নাতাশা, সিকলি, কাতিয়া। নাম শুনেই বোঝা যাচ্ছে সেসময় সোভিয়েত বইয়ের জগতে ডুবে থাকা শুরু হয়েছিল। পড়তে শিখেছিলাম চার বছর বয়সে। তারপর থেকে সোভিয়েত বইয়ের চরিত্রগুলো হয়ে উঠেছিল প্রিয় বন্ধু।কেন তুপা পাখি ধরে না, চুক আর গেক, চড়ুইছানা, অকর্মার চিঠি, ভোভকা, বেড়াল ছানা, লালমাটিয়া পাহাড়, মালাকাইটের ঝাঁপি, রুশ দেশের উপকথা, মণির পাহাড়, নীল পাতার মতো বইগুলো ছিল প্রিয় সঙ্গী।
স্কুলে ভর্তি হওয়ার পরও বাড়িতে একাকীত্ব কাটেনি। স্কুলে অনেক বন্ধুবান্ধব হয়েছিল। নুসরাত, রত্না, ফারিয়া লারা, মাকসুদ, শেলী।। কিন্তু বাড়িতে ফেরার পর একা। আর সামার ভ্যাকেশন, উইন্টার ভ্যাকেশনের লম্বা দিনগুলোতে তো খুব খুব একা। তবে সেজন্য যে আমার খারাপ লাগতো তা নয়। অসংখ্য বই ছিল। টিভি সিরিজগুলো ছিল, ছবি আঁকার খেলা ছিল, হাঁস, মুরগি, গাছ-গাছালি ছিল। কয়েকটা খেলনা ও পুতুল ছিল। পুতুলগুলোরও নানা রকম নাম। ভলোদিয়া, তামারা, লুদমিলা, ইভান, ভাসিলিসা। এগুলো ছোট ছোট পুতুল। বড় পুতুল ছিল একটাই। নাম জুলি। ও কিন্তু রাশিয়ান নয়। ও খাঁটি আমেরিকান। পিয়ারু চাচা(আমার বাবারা খালাতো ভাই) আমেরিকায় থাকেন। তিনি উপহার দিয়েছিলেন। বাক্সের উপর নাম লেখা ছিল জুলি। তখন বোধহয় বছর তিনেক বয়স। জুলিও আকৃতিতে তিন বছর বয়সী বাচ্চার মতোই বড়। জুলিকে আমি কবিতা, গল্প শোনাতাম। ওর সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপও করতাম। স্কুলে ভর্তি হওয়ার পর কয়েকদিন ক্লাসে নিয়েও গিয়েছিলাম। নুসরাত প্রায়ই বলে, ও প্রথমদিন আমার সঙ্গে একটা পুতুল দেখে খুব অবাক হয়েছিল।
তবে আমার সেরা সঙ্গী ছিলেন অবশ্যই ঠাকুর বাড়ির ছোট রাজকুমার রবি। মায়ের সঞ্চয়িতা আর রবীন্দ্র রচনাবলীর প্রথম খণ্ড(ঝিনুক অথবা মুক্তধারা বের করেছিল), গল্পগুচ্ছ আমি দখল করে নিয়েছিলাম। কিছু পড়তাম, কিছু ছবি দেখতাম। আরেকটা বই পেয়েছিলাম স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হওয়ার পুরস্কার কিশোর রবীন্দ্রনাথ। হায়াৎ মামুদের লেখা। শিশুদের জন্য রবীন্দ্র জীবনী। সেখানে কিশোর রবীন্দ্রনাথের ছবি ছিল। সেই ছবির রাজপুত্রর সঙ্গে কত কথা যে বলতাম। পেয়ারা গাছের ডালে বাবা আমার জন্য একটা দোলনা টাঙিয়ে দিয়েছিলেন। সারা দুপুর সেই দোলনায় বসে রবির সঙ্গে গল্প করতাম। তার কবিতা তাকে শোনানো আর আমার কবিতার কথা তাকে বলা। জুলিও যোগ দিত আমাদের আলাপে। আমি কখনও দুপুরে ঘুমাতে পারতাম না। এখনও পারি না। দৈবাৎ দু’একদিন দুপুরে ঘুমালে সন্ধ্যায় আমার ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়। তাই সারা দুপুর ছবি আঁকা, বই পড়া, নাহয় তো জুলি,রবির সঙ্গে গল্প। মোরগ মুরগি আর হাঁসদের সঙ্গেও অল্প অল্প কথা বার্তা হতো।
আমার নানুর বাড়ি সেগুন বাগিচায়। সেখানে বেড়াতে যাওয়া হতো প্রায়ই। নানুর কাছ থেকে দুটি বেড়ালছানা এনেছিলাম। একটির নাম স্পুতনিক, আরেকটির নাম রকেট। দুটোই মারাত্মক দুষ্টু। বিশেষ করে রকেট ছুটে ছুটে সকলের পায়ের গোড়ালিতে কামড়াতো, পর্দা আর বেড কভারের ফ্রিল ধরে ঝুলতো। বাবা বললেন, এগুলোর নাম হিটলার আর নাৎসি রাখা হোক।
আমি তখন সব কিছুর নামকরণ করতাম। গাছদের, পশুপাখির, পুতুলদের। বাবা তিনটি রিকশা কিনেছিলেন। সেগুলো কয়েকজন দরিদ্র নিঃস্ব মানুষকে চালাতে দেন। তারা প্রতিদিন কিছু টাকা করে জমা দিত। পরে সেই টাকা থেকে কিছু কিছু জমিয়ে রিকশার দাম উঠে গেলে সেগুলো ওদের নিজস্ব হয়ে যেত। আমি ও ভাইয়া সেই রিকশাগুলোরও নামকরণ করেছিলাম। জ্যাসন, সায়মন আর রজার মুর হলো তিনটি রিকশার নাম।
ছয়-সাত বছর বয়সে আমার আরেকজন বন্ধু হন। ভ্লাদিমির ইলিচ লেনিন। সোকোলিনিতে নববর্ষ, স্ফুলিঙ্গ থেকে অগ্নিশিখা, লেনিনের গল্প, রুশ ইতিহাসের কথাকাহিনী এমনি আরও অনেক বই ছিল।সেসব বইতে লেনিনের ছবি, লেনিনের গল্প আর বাবার মুখে লেনিনের জীবনের কথা শুনে শুনে তাকে ভীষণ আপন মনে হতো। লেনিনকে নিয়ে কবিতাও লিখেছিলাম। লেনিন ও রবীন্দ্রনাথ আমার আজীবনের বন্ধু হয়ে এখনও রয়ে গেছেন। একজন আমার গুরুদেব অন্যজন বিপ্লবী নেতা।
শৈশব থেকে কিশোরবেলা, তারপর তারুণ্য। এখন মধ্যবয়স। আমার নিজস্ব জগতা ক্রমশ আরও প্রসারিত হয়েছে। ইতিহাস আর মিথোলজির পাঠ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রিয় শখ। একসময় ছোটদের বিশ্বকোষ খুব পড়তাম। কত কিছু জানা হতো। সেটা নেশা হয়ে দাঁড়ালো ক্রমে ক্রমে। নতুন কিছু জানতে, নতুন বই পড়তে বিশেষ করে ইতিহাসের বই পড়তে যে কি ভালো লাগে।
অনেক মানুষের ভিড়েও আমি একা থাকতে পারি। বন্ধু, বান্ধব অনেক হয়েছে। ভালোবাসাও। সংসার, সন্তান। সবকিছুই। তবু আমার নিজস্ব জগতটা কিন্তু আমারই আছে। শাহিনের সঙ্গে আমার সম্পর্ক বেশ ভালো। কিন্তু তারপরও আমি একা, নিজের সঙ্গে নিজে কিছুটা সময় কাটাতে ভালোবাসি।
যখন চীনে একা থাকি। সেখানেও বন্ধু বান্ধব তো হয়েছে অবশ্যই। তবুও এমন অনেক দিন যায় যেদিন কারও সঙ্গে একটি বাক্যও বিনিময় হয়নি। অনেকেই প্রশ্ন করেন একা থাকতে খারাপ লাগে না? আমি হাসি। সত্যিই কি খারাপ লাগে? নিঃসঙ্গ লাগে? মোটেই না। আমার নিজস্ব একটি পৃথিবী আছে। সেখানে আজও আমার অনেক সঙ্গী। তারা কেউ কেউ প্রিয় উপন্যাসের চরিত্র, কেউ প্রিয় লেখক। আর এখন তো নেট থেকে অসংখ্য বই ডাউনলোড করা যায়। ইউ টিউবে ক্ল্যাসিক ছবিগুলো দেখা যায়। ভ্যান গঘ, গঁগার পেইন্টিংগুলো দেখে নেয়া যায়। বিশ্বের যে কোন বিষয়ে জানতে চাইলেই ধারণা পাওয়া যায়। নতুন কোন বই যখন ডাউনলোড করি মনে হয় সোনার খনির খোঁজ পেয়েছি।
আমি কখনও একা হই না। একাকীত্বের যন্ত্রণা কাকে বলে আজও বুঝতে পারি না।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close