আমাদের ওয়েবসাইট www.womeneye24.com আপডেটের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দু:খিত
ইতিহাসের সাহসী নারী

বিপ্লবী কল্পনা দত্ত

ওমেনআই প্রতিবেদক:
পরিবারের দেওয়া নাম কল্পনারানি দত্তগুপ্ত। ১৯১৩ সালের ২৭ জুলাই মহান বিপ্লবী কল্পনা দত্ত জন্মগ্রহন করেন।
ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষার ফর্মে নিজের নাম লিখেছিলেন কল্পনা দত্ত, তারপর আমৃত্যু্ কল্পনা দত্ত নামেই তিনি পরিচিত। ১৯২৯ সালে চট্টগ্রামের ডঃ খাস্তগীর ইংলিশ হাইস্কুল ফর গার্লস থেকে ম্যাাট্রিকুলেশন পাশ করে পড়তে আসেন কলকাতার বেথুন কলেজে, থাকতেন কলেজ সংলগ্ন বেথুন হস্টেলে। সেসময় যোগাযোগ হয় বেথুন কলেজেরই ছাত্রী কল্যাুণী দাশ ও তাঁদের সংগঠন ‘ছাত্রী সংঘ’-র সাথে।
কল্পনা দত্ত সিমলা ব্যাায়াম সমিতির আখড়ায় লাঠিখেলা, ছোরাখেলা, জুডু শেখাও শুরু করেন। বেথুন কলেজে গঠন করেন ছাত্রী সমিতি। বেথুন কলেজে পড়ার সময়েই যোগাযোগ হয় বিপ্লবী পূর্ণেন্দু দস্তিদার, মনোরঞ্জন রায়দের সঙ্গে।
১৯২৯ সাল থেকেই কল্পনা দত্ত বিপ্লবী রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ১৯৩০-এর এপ্রিলে চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার অভিযান হয়। মে মাসে গরমের ছুটিতে কল্পনা কলকাতা থেকে চট্টগ্রামে দেশের বাড়িতে চলে যান। সেখানে এলাকা ধরে বিপ্লবী কাজকর্ম শুরু করেন। কলকাতা থেকে ট্রান্সফার নিয়ে ভর্তি হন চাটগাঁর কলেজে। বছরখানেক পর, ১৯৩১-এর জুনে, তাঁর সঙ্গে বিপ্লবী সূর্য সেনের প্রথম দেখা হয়। তখন জেলে বন্দি গণেশ ঘোষ, অনন্ত সিংসহ বিপ্লবীদের জেলে ভেঙে মুক্ত করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। কল্পনা দত্ত ছদ্মবেশে জেলবন্দি বিপ্লবীদের সঙ্গে দেখা করতে যেতেন এবং কল্পনা দত্তের মাধ্যমেই জেলের বাইরে থাকা মাষ্টারদারা জেলবন্দি অনন্ত সিং-দের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন। ১৯৩১ সালেই ‘ডিনামাইট ষড়যন্ত্র’ মামলায় সন্দেহভাজন হিসাবে পুলিশ তাঁর গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করে গৃহবন্দি করে রাখে। পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে কল্পনা রাতের অন্ধকারে পুরুষের বেশে বিপ্লবীদের আশ্রয়স্থলে চলে যেতেন।
১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বর মাস। চট্টগ্রামের আদালত চত্ত্বর ভিড়ে ঠাসা। আজ লোকনাথ বল, অনন্ত সিং দের আদালতে হাজিরার দিন। চট্টগ্রাম জেল থেকে বেরল প্রিজন ভ্যান। পুলিশ কর্তাদের কাছে খবর গেলো আজ হামলার ছক করছে বিপ্লবীরা। পুলিশ প্রত্যেকটা লোককে সতর্ক ভাবে পরখ করছে। ভিড়ের মধ্যে দেখা গেলো এক মুসলিম মহিলা বোরখা পরে দাঁড়িয়ে আছে। মহিলাদের মধ্যে নজর কাড়ছে তার উচ্চতা। সঙ্গে সঙ্গে থানায় খবর গেলো মহিলা ফোর্স পাঠানোর। অত্যন্ত গোপনে মহিলা পুলিশ বাহিনী ঘিরে ফেলল এলাকা। চোখের নিমেষে উধাও সেই মহিলা। আদালতের গেটেও বাহিনী ছিল,কিন্তু কোথা দিয়ে কেমন ভাবে পালালো বোঝাই গেলো না। একটু আগে যে শীর্ণ বৃদ্ধা ঘোমটা দিয়ে লাঠি ঠুকে ঠুকে ধীর পায়ে বেরিয়ে গেলো, তিনিই কল্পনা। পুলিশ আবার মিস করলো তাকে। কিন্তু আদালত চত্ত্বর থেকে যা পেলো মারাত্মক বিস্ফোরক গান কটন । কার্পাস তুলোর ওপর নাইট্রিক অ্যাসিডের মিশ্রন দ্বারা তৈরি এই গান কটন ডিনামাইটের মতো কাজ করে। বিপ্লবীদের প্ল্যান ছিল এই গান কটন দিয়ে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে বন্দিদের মুক্ত করা। আর এর গুরু দ্বায়িত্ব পড়েছিল কল্পনার কাঁধে। সতর্ক পুলিশ জেলের মধ্যে থেকেও উদ্ধার করলো ওই বিস্ফোরক। যে পদার্থের ভয়ে বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ,ফ্রেঞ্চ আর্মি কেঁপে যেতো, সেই পদার্থ পোশাকের মধ্যে করে জেলে সরবরাহ করেছে এই মেয়ে।
এর পরে পুলিশ গতিবিধি নিয়ন্ত্রণ করলো কিন্তু প্রমাণের অভাবে গ্রেপ্তার করতে পারলনা। তিনি সরাসরি যোগাযোগ করলেন মাস্টারদার সাথে। আবেদন জানালেন পরোক্ষ নয়, প্রত্যক্ষ লড়াইয়ে নামতে চান তিনি। অনেক বোঝালেন সূর্য সেন। কিন্তু তিনি অনড়। শেষে মাস্টারদার উদ্যোগে কল্পনা দত্ত ও প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার নামের দুই বীরাঙ্গনা স্থান পেলেন বাহিনীতে । দেশপ্রেম ,অদম্য সাহসে,বন্দুক পিস্তলে নিখুঁত নিশানায় মাস্টারদাকে মুগ্ধ করলেন দুই নারী । কল্পনা নতুন বিপ্লবীদের শেখাতে লাগলেন বিস্ফোরক তৈরির পদ্ধতি।
১৯৩২ সাল। ১৭ সেপ্টেম্বর। পাহাড়তলীতে প্রথমবার গ্রেপ্তার হন কল্পনা ।পাহাড়তলির ইউরোপিয়ান ক্লাব আক্রমণ করা হবে। তার ওপর দায়িত্ব পড়লো ছদ্মবেশে ক্লাবে গিয়ে তার নিরাপত্তা ব্যবস্থা, ঢোকা বেরনোর পথ দেখে অভিযানের পরিকল্পনা করে আসতে। পুরুষের ছদ্মবেশে ক্লাবে ঢুকতে গিয়ে ধরা পড়ে গেলেন তিনি। সঙ্গে অস্ত্র বা কিছু না থাকায় ভবঘুরে অপরাধে পুলিশ গ্রেপ্তার করলো তাকে। কথা বের করার জন্য জেলের মধ্যে চলল অকথ্য অত্যাচার, অশ্লীল অপমান। বন্ধ কুঠুরিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আটকে রাখা, দৈহিক নির্যাতন ছিল রোজের ঘটনা। কিন্তু একটি কথা বার করা যায়নি তাঁর থেকে। সব কিছুর মুখে অবিচল ছিলেন তিনি। ২মাস পরে ব্যর্থ হয়ে পুলিশ তাঁকে ছেড়ে দেয়।
বেরিয়েই তিনি আবার সক্রিয় হয়ে ওঠেন বিপ্লবী দলে। আত্মগোপন করে থাকার সময় ১৯৩৩ এর ১৬ ফেব্রুয়ারি গইরালা গ্রামে যখন মাস্টারদা তাঁদের নিয়ে মিটিং করছেন, গোপনে খবর পেয়ে পুলিশ ঘিরে ফেলে। শুরু হয় গুলির লড়াই। অসমসাহসী কল্পনা সামনে থেকে গুলি বৃষ্টি শুরু করেন। দিশাহারা হয়ে যায় পুলিশ। তিনি পালিয়ে যান। কিন্তু ধরা পড়েন মাস্টারদা। নেতার এই বিপর্যয়ে দলে সংকট দেখা দেয়। শুরু হয় পালিয়ে বেড়ানোর জীবন। তিন মাস পর আবার পুলিশ ঘিরে ফেলে তাঁদের। আবার শুরু হয় লড়াই। এবার পুলিশ অনেক বেশি। তাই কল্পনাসহ গোটা দল ধরা পড়ে পুলিশের হাতে।
চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার লুণ্ঠন, ষড়যন্ত্র, বিস্ফোরক, হত্যা নানা অপরাধে সূর্য সেন ও তারকেশ্বর দস্তিদারের ফাঁসির আদেশ হয়। মহিলা ও বয়স কম বলে কল্পনার ফাঁসি হোলনা। তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হোল। ১৯৩৯ সালে ছাড়া পেলেন তিনি। জেলে বসেই শুনেছিলেন মাস্টারদার ফাঁসির খবর ।
রাজশাহী আর হিজলীর জেলে ছ’বছর কাটিয়ে ১৯৩৯-এর ১ মে মুক্তি পান কল্পনা। তাঁর জেলে বন্দি থাকার সময় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে গভর্নরের সঙ্গে দেখা করে কল্পনার মুক্তির আর্জি জানিয়েছিলেন; কল্পনার বাবাকে লিখেছিলেন, “তোমার কন্যার জন্যে যা আমার সাধ্য তা করছি, তার শেষ ফল জানবার সময় এখনও হয়নি; আশা করি, চেষ্টা ব্যর্থ হবে না।” জেল থেকে মুক্তি পেয়ে কল্পনা রবীন্দ্রনাথকে ধন্যবাদ জানিয়ে চিঠি লেখেন এবং প্রত্যুেত্তরে রবীন্দ্রনাথ কল্পনাকে আশীর্বাদ জানিয়ে যে চিঠিটি লিখেছিলেন । তা হলো:
“তোমার চিঠিখানি পেয়ে খুশি হলুম। অনেকদিন পরে মুক্তিলাভ করেছ—এখন দিনে দিনে শান্তি ও শক্তিলাভ করো, এই কামনা করি। দেশে অনেক কাজ আছে, যা অচঞ্চল ও সমাহিত চিত্তে সাধন করবার যোগ্য । দুঃখভোগের অভিজ্ঞতা তোমার জীবনে পূর্ণতা দান করুক, এই আমি আশীর্বাদ করি।”
১৯৩৯ সালের চব্বিশে জুন এই চিঠি লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।
জেল থেকে বেরোনোর পরে ১৯৪০ সালে কল্পনা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এই সময়েই ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টিতে যোগ দেন এবং বাংলার দুর্ভিক্ষের উপর পার্টির পত্রিকা ‘পিপলস্ ওয়ার’-এ রিপোর্ট লেখা শুরু করেন। জেলফেরতা কমিউনিষ্ট কর্মী কল্পনাকে ১৯৪০-এর নভেম্বর থেকে ১৯৪১-এর ডিসেম্বর পর্যন্ত গৃহে অন্তরীণ করে রাখে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা। ১৯৪৩ সালে বোম্বেতে কমিউনিষ্ট পার্টির সম্মেলনে চট্টগ্রামের প্রতিনিধি হিসাবে যোগ দেন কল্পনা। এখানেই পার্টির সাধারণ সম্পাদক পূরণচাঁদ যোশীর সঙ্গে আলাপ এবং বিবাহ। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে কল্পনা দত্ত ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির প্রতিনিধি হিসাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন এবং কল্পনা দত্তের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারে এসে জওহরলাল নেহেরু কমিউনিষ্টদের আগাগোড়া সমালোচনা করলেও তাঁদের প্রার্থী কল্পনা দত্তকে ‘বাহাদুর লড়কী’ বলতে বাধ্য হন।
১৯৪৫ সালে ইংরিজিতে প্রকাশিত হয় কল্পনা দত্তের স্মৃতিকথা ‘Chittagong Armoury Raiders: Reminiscences’ (Bombay: People’s Publishing House) এবং পরের বছর জানুয়ারিতে বাংলায় প্রকাশিত হয় ‘চট্টগ্রাম অস্ত্রাগার আক্রমণকারীদের স্মৃতিকথা’ (কলকাতা: বঙ্গীয় প্রাদেশিক কমিটি, ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টি, ১৯৪৬)। সে বছরেই কল্পনা পাকাপাকিভাবে দিল্লী চলে যান। এরপর বিভিন্ন সময়ে কল্পনা দত্ত যুক্ত থেকেছেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় জাতীয় সংহতি পরিষদ (NSS), বিপ্লবতীর্থ চট্টগ্রাম স্মৃতি সংস্থা, জালালাবাদ শহিদ স্মরণ মঞ্চের সঙ্গে। নয়া দিল্লীর রুশ ভাষা ইন্সটিট্যুটের চেয়ারপার্সন হিসাবেও কাজ করেছেন এবং আমৃত্যু যুক্ত থেকেছেন ভারতের কমিউনিষ্ট পার্টির সঙ্গে। পার্টির দিল্লী কমিটির সদস্য ছিলেন কল্পনা দত্ত (যোশী)। ১৯৯৫ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি এই বিপ্লবী-কমিউনিষ্টের জীবনাবসান হয়।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close