আমাদের ওয়েবসাইট www.womeneye24.com আপডেটের কাজ চলছে। সাময়িক অসুবিধার জন্য আমরা দু:খিত
সাক্ষাৎকার / ব্যক্তিত্বস্পট লাইট

‘নারী বৈষম্যের প্রথাগত ধারাটিকে আমি ভেঙে দিতে চাই’ রুবাইয়াত হোসেন

খাদিজা খানম তাহমিনা : রুবাইয়াত হোসেন। বাংলাদেশি একজন চলচ্চিত্র নির্মাতা, চিত্রনাট্যকার ও প্রযোজক। তিনি আন্তর্জাতিভাবে প্রশংসিত ও প্রতিষ্ঠিত। চলচ্চিত্রে সমাজকে দেখেছেন নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গীতে। মূলত নারী প্রধান চলচ্চিত্র নির্মাতা । এই সমাজে নারীর জীবনের জটিলতা,বৈষম্য ও সংগ্রামকে তার চলচ্চিত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন। তার চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের নারীর কন্ঠস্বর শোনা যায়। পুরুষপ্রাধান্যের চলচ্চিত্র নির্মাণ-পরিবেশে তার স্বতন্ত্র অবস্থান বিশেষভাবে উল্লেখ করার মতো।
তার নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘মেহেরজান’ পরিচালনার মাধ্যমে ২০১১ সালে তিনি নির্মাতা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। প্রথম চলচ্চিত্র দিয়েই তিনি আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হন এবং বিভিন্ন চলচ্চিত্র উৎসবে পুরস্কার পান। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে তৈরি ‘মেহেরজান’ চলচ্চিত্রটি বাংলাদেশে তখন তুমুল সমালোচনার ঝড় তোলে। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় একজন বাংলাদেশি মেয়ে পাকিস্তানি এক সৈন্যের প্রেমে পড়ে । মূলত যুদ্ধ এবং প্রেম এ নিয়েই কাহিনীর গতি প্রকৃতি । চলচ্চিত্রটি বিতর্কের ঝড় তোলে। বিক্ষোভের মুখে মুক্তি পাওয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে ডিসট্রিবিউটররা হল থেকে ছবিটি নামিয়ে ফেলতে বাধ্য হন। তবে এই ছবিটি যেমন একাধারে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে তেমনি এনে দিয়েছে পরিচিতি ও খ্যাতি । বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় এবং বেশ কয়েকটি পুরস্কার পায়। দ্বিতীয় চলচ্চিত্র ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ মুুক্তি পায় ২০১৫ সালে,এটি শহুরে এক মধ্যবিত্ত নারীর অসুখি দাম্পত্য জীবন নিয়ে এবং এটিও বেশ প্রশংসিত হয় আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে।
“মেড ইন বাংলাদেশ” চলচ্চিত্র তাঁর নির্মাণের সাম্প্রতিক ছবি। সিনেমাটি টরেন্টো চলচ্চিত্র উৎসব ২০১৯ এ প্রিমিয়ামের পর ডিসেম্বরে ফ্রান্স, পর্তুগাল, ও ডেনমার্কে মুক্তি পায় এবং ব্যাপক সাড়া ফেলে। ২০২০ সালে কানাডা, আমেরিকা, ও বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছবিটি মুক্তির কথা আছে। ক্রমেই তিনি হয়ে উঠছেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রতিনিধি ।

রুবাইয়াত ২০০২ সালে নিউইয়র্ক ফিল্ম একাডেমিতে চলচ্চিত্র পরিচালনায় ডিপ্লোমা সম্পন্ন করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত স্মিত কলেজ থেকে উইমেন্স স্টাডিজে স্নাতক এবং পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দক্ষিণ এশীয় গবেষণা এবং নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের টিশ স্কুল অব আর্টস থেকে চলচ্চিত্র বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।

ভার্চুয়াল মাধ্যমে মুখোমুখি হই এই গুণী তরুণ নির্মাতার সঙ্গে….

প্রশ্নঃ আপনার চলচ্চিত্র নির্মাণের শুরুটা কীভাবে?

রুবাইয়াত হোসেনঃ আমি ছোটবেলা থেকে ছবি আঁকতাম, একজন পেইন্টার হবো ভেবে। এখনও আঁকি। ১৮/১৯ বছর বয়সে এসে আমি সত্যজিৎ রায়ের অনেক বই পড়ি, এক সময় ‘বিষয় চলচ্চিত্র’ নামে একটা বই আমার হাতে আসে, যেটা ফিল্ম নিয়ে, সেটা পড়ে আমি ভীষণ অনুপ্রাণিত হই এবং তাঁর প্রায় সবগুলো সিনেমা একের পর এক দেখতে থাকি। তখন আমার মনে হলো, আমিও তো পারি, এধরণের সিনেমা বানাতে । মূলত তখন থেকেই সিনেমা তৈরির বীজটা আমার ভেতরে ঢুকে। আর তখন থেকেই আমি নিজেকে তৈরি করতে থাকি। আমার একাডেমিক পড়াশোনার পাশাপাশি সিনেমা বিষয়ে পড়াশোনা করি, বিভিন্ন কোর্স করি। তারপর নিজে একটা ডিএসএলআর ক্যামেরা কিনি এবং ছোট ছোট ফটোশ্যূট করে করে শর্টফিল্ম বানাতে শুরু করি। এরই মধ্যে আমি আইন ও সালিশকেন্দ্রে, নারীপক্ষে নারী অধিকার নিয়ে কাজ করি। এছাড়াও ব্র্যাকে লিঙ্গ বৈষম্য নিয়ে কাজ করেছি। মুলত আমার প্রস্তুতিটা ছিল দীর্ঘ ৮ বছরের। এই ৮ টি বছর নিজেকে একজন ফিল্ম মেকার হিসেবে দাঁড় করাতে সময় নিয়েছি।

প্রশ্নঃ আপনার চলচ্চিত্রগুলো নারী কেন্দ্রীক, এটার কি কোনো কারণ আছে?

রুবাইয়াত হোসেনঃ অবশ্যই। চলচ্চিত্রে পুরুষদের প্রাধান্য লক্ষ্য করা যায়, এটা শুধু এখন নয়, চলচ্চিত্র জগতের শুরু থেকে নারী বৈষম্যের শিকার। নারীকে দেখানো হয় সৌন্দর্যের বিষয় হিসেবে, কিন্তু প্রাধান্য থাকে পুরুষ অভিনেতার, এই বিষয়টি আসলে আমি মানতে পারি না। মুলত নিজের বক্তব্যটাই আমি আমার চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছি। এটা আমার সিনেমার রাজনৈতিক বক্তব্য বলা যায়। নারী বৈষম্যেের প্রথাগত ধারাটিকে আমি ভেঙে দিতে চাই। নারীর জীবন কতটা জটিল, নিজের অভিজ্ঞতা, পাশের মানুষগুলোর জীবনের অভিজ্ঞতা দিয়ে আমি দেখেছি, উপলব্ধি করেছি। আসলে প্রত্যেকেই নিজের গল্পটা পৃথিবীর মানুষকে বলেন নিজের কাজের জায়গা থেকে, আমিও নারীর তথা আমার ক্ষমতায়নের জায়গাটাই তুলে ধরতে চেয়েছি।

প্রশ্নঃ মেহেরজান ২০১১,, আন্ডার কনস্ট্রাকশন ২০১৫-১৬, তারপর মেড ইন বাংলাদেশ ২০১৯-২০২০.. ছবিগুলোর মধ্যে সময়ের বেশ বিরতি, এই দীর্ঘ বিরতির বিশেষ কোন কারণ আছে কি, বা কোনো উদ্দেশ্য আছে কি?

রুবাইয়াত হোসেনঃ আমি একটা সিনেমা বানানোর আগে অনেক রিসার্চ করি। একটা ছবি আগে আমি স্ক্রিপ্ট করি, তাতে সময় নেই ১ বছর, আর বানাতে ১ বছর। একটা ফিল্ম তৈরির আগে একটা চিন্তা থাকে, নিজেকে চেঞ্জ করতে হবে। প্রি-প্রোডাকশন থেকে শুরু করে পোস্ট-প্রোডাকশন করতে করতে সময় কিন্তু চলে যায়, এটা আমার কাছে ন্যাচারাল লাগে। মনে হয়, এতটুকু সময় প্রয়োজন, যদি ভালো কিছু দেয়ার চিন্তা করি।

প্রশ্নঃ ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নির্মাণের নেপথ্যের গল্পটা জানতে চাই।

রুবাইয়াত হোসেনঃ রিসার্চের কাজে আমি নারী পোশাক শ্রমিকদের নিয়ে কাজ করি। তখন ডালিয়া নামের একজন নারী পোশাক শ্রমিকের সাথে আমার পরিচয় হয়। ওর সাথে পরিচয় হওয়াটাই আসলে এই ছবির মূল ইন্সপিরেশন। ডালিয়া আক্তারের সাথে যখন আমার পরিচয় হয়, তখন তার বয়স ছিলো ২৩, সে আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলো এবং তখন সে ইউনিয়ন প্রেসিডেন্ট ছিলো। আমি খুব অবাক হয়ে যাই, এত ছোট একটা মেয়ে, এত বড় একটা দায়িত্ব নিয়ে এত ফাইট সে কিভাবে করছে… । তখন আমি ভাবলাম এই মেয়েটার মধ্যে যে স্পিরিট, তার ফাইট করার যে পাওয়ার তা আমাকে খুব ইমপ্রেস করে। তখন তার সাথে আমার একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। ওর জীবনের ঘটনাগুলোর ভিত্তিতেই “মেড ইন বাংলাদেশ” ছবিটা তৈরি করি…।

প্রশ্নঃ ‘মেহেরজান’ প্রদর্শিত হওয়ার পর আলোচনা সমালোচনার তুমুল ঝড় উঠেছিল, তখন কিভাবে সামলিয়ে ছিলেন পরিস্থিতি বা নিজেকে?

রুবাইয়াত হোসেনঃ ফ্যামিলি আমার পাশে ছিল। আর আমিও আমার নিজের জায়গাটায় ঠিক ছিলাম। এটা ঠিক তখন খুব খারাপ লেগেছিলো কিন্তু আমি ভয় পাইনি। অনেকে আমাকে বাজে বাজে মেসেজ করেছিল, কমেন্ট করেছিলো, বাট আমি পাত্তা দেইনি। কারণ কেউ যদি আমার সাথে ভালোভাবে বিষয়টা নিয়ে কথা বলতো, আমি রিপ্লাই দিতাম, কিন্তু অনেকে আমার সাথে ক্রিমিনাল অফেন্সিভ বিহেইভ করেছে, তাদের কথা শোনার, তাদের কমেন্টের রিপ্লাই দেয়ার প্রয়োজন আমি মনে করিনি। তবে তখন খুব ফিল করেছিলাম, আমাকে আরেকটা ফিল্ম বানাতে হবে।

প্রশ্নঃ বর্তমানে কি কি কাজ নিয়ে ব্যস্ত আছেন?

রুবাইয়াত হোসেনঃ এখানে থেকেই (আমেরিকা) ঢাকায় একটি শর্ট ফিল্ম বানিয়েছি। নতুন ছবির স্ক্রিপ্ট করছি। আরেকটি সিনেমা ( আমার নয়) প্রডিউস করছি। এইতো…

প্রশ্নঃ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় হোম ভিডিও প্লাটফর্ম ক্রাইটেরিয়ন কালেকশনের চলচ্চিত্র সাময়িকী ‘দ্য কারেন্ট’ এর ‘দশের দশকের গুপ্তধন’ এর শীর্ষ দশে স্থান পেয়েছে আপনার ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ অনুভূতিটা পাঠকদের/ আপনার ভক্তদের সাথে শেয়ার করুন প্লিজ…।

রুবাইয়াত হোসেনঃ অনুভূতিটা সত্যি অসাধারণ ছিলো। বিষয়টা আনএক্সপেক্টেড ছিলো, আমি ভাবতেই পারিনি এমন একটা নিউজ আমার জন্য অপেক্ষা করছিল। ভীষণ খুশি আমি।

প্রশ্নঃ বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই কি ছবির নামকরণ করেন?

রুবাইয়াত হোসেনঃ অবশ্যই। একটা ফিল্মের নামটা খুব ইম্পর্ট্যান্ট। সিনেমার বিষয়বস্তুর সাথে সামঞ্জস্য রেখেই সিনেমার নামকরণ করা হয়েছে। ‘মেড ইন বাংলাদেশ’, ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’, মেহেরজান প্রতিটা ছবিতে গল্পের বিষয়বস্তুর সাথে সামন্জস্য রেখেই নামকরণ করা হয়েছে।

প্রশ্নঃ আপনার চলচ্চিত্রের মধ্যে কোন ম্যাসেজ দেয়ার চেষ্টা করেন কি? আর মাধ্যম হিসাবে চলচ্চিত্র বেছে নেয়ার কোন কারণ আছে কি?

রুবাইয়াত হোসেনঃ ভিজুয়াল আর্টের মাধ্যমে ব্যক্তির নিজস্ব ভাবনাটা বের হয়ে আসে । সত্যি বলতে আলাদা কোনো মেসেজ দেয়ার চিন্তা করিনি। তবে এটা ঠিক যে আমার ভেতরকার ভাবনাগুলো চলে আসে। যেমন, নারী শ্রমিকদের স্ট্রাগলটাকে আমি পজিটিভ ভাবে দেখানোর চেষ্টা করেছি।

মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র বেছে নেয়ার কারণটা তো প্রথমে বলেছি, আমি অনুভব করেছি, এটা নিয়ে আমি কাজ করতে পারি।

প্রশ্নঃ একজন তরুণ নির্মাতা হিসেবে চলচ্চিত্রে অন্য তরুণ নির্মাতাদের প্রতি আপনার পরামর্শ কি? বা এই মাধ্যমে যারা কাজ করতে চায় তাদের উদ্দেশে কিছু বলেন।

রুবাইয়াত হোসেনঃ আমার শুরুটা কিন্তু আমি নিজে নিজে করেছি। আমি নিজে নিজে কাজটা শিখেছি, নিজের কাজটাকে আন্তর্জাতিক ফেস্টিভ্যাল পর্যন্ত নিয়ে যেতে পেরেছি। প্রবল ইচ্ছাশক্তি থাকতে হবে। বসে না থেকে সময়টাকে কাজে লাগাতে হবে। আসলে বেশি কিছুর প্রয়োজন নাই। এখন তো ইন্টারনেটে অনেক টিউটোরিয়াল আছে, যা আপনাকে অনেক সহযোগিতা করতে পারে।

প্রশ্নঃ পরবর্তী টার্গেট বা কাজ সম্পর্কে কি কিছু জানাবেন?

রুবাইয়াত হোসেনঃ স্ক্রিপ্ট করছি, স্ক্রিপ্ট করতে এই বছরটা লেগে যাবে। তবে শেষ করার আগে কিছু বলতে চাই না। শ্যুটিং হওয়ার পর নিউজটা দিবো। কারণ আমরা কেউই জানিনা, আমার ছবিটা আদৌ আমি রিলিজ করতে পারবো কিনা, তাই আগে আগে কিছু বলতে চাচ্ছিনা।

প্রশ্নঃ সাম্প্রতিক করোনাকাল নিয়ে কি কোন গল্প বা চলচ্চিত্র নির্মাণের পরিকল্পনা আছে?

রুবাইয়াত হোসেনঃ না নাই, এবং আমি এটা নিয়ে কোন চলচ্চিত্র নির্মান করবো না। সত্যি বলতে কি, এটা নিয়ে অনেকে প্রচুর কাজ করছে এবং আরও অনেকেই কাজ করবে।
তবে একেবারেই করছি না, তা নয়, ঢাকায় যে শর্ট ফিল্মটা বানিয়েছি, সেটা করোনাকে কেন্দ্র করেই। বাংলাদেশের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বানানো হয়েছে শর্টফিল্মটা। তবে আপাততঃ ইচ্ছা নাই।

আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ আমাদেরকে এতটা সময় দেয়ার জন্য। শুভ কামনা আপনার জন্য।

রুবাইয়াত হোসেনঃ আপনাকেও ধন্যবাদ।

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close