স্পট লাইটস্লাইড

নারীর ক্ষমতায়ন: বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়নে শেখ হাসিনা

 

ফরিদা ইয়াসমিন:
হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শোষনমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির কথা বলেছিলেন। এই মুক্তি নারী-পুরুষ নির্বিশেষে বাঙালির। তিনি বুঝেছিলেন নারীকে সমানতালে এগিয়ে না আনলে বাঙালি জাতি হিসেবে সমৃদ্ধ হবে না। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন নারীর ক্ষমতায়নে এবং সেই লক্ষ্যে কাজ করেছেন জীবনভর। তিনি দলের ভেতরে প্রথম থেকেই এর চর্চা শুরু করেছিলেন।

ছয় দফার আন্দোলনে বঙ্গবন্ধু গ্রেফতার হওয়ার আগে আমেনা বেগমকে (১৯২৫-১৯৮৯) দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের পদে মনোনয়ন দেন এবং ওই বছর ২৭ জুলাই আমেনা বেগমকে দলের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। এই সময় আওয়ামীলীগের কোন কোন প্রবীণ পুরুষ নেতা আপত্তি তুলেছিলেন। বলেছিলেন, এই সংগ্রামের চরম মুহূর্তে একজন নারীকে দলের নেতৃত্ব দিলে হয়ত সাধারণ মানুষ সাড়া দিবে না। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ”নারীদেরও পুরুষদের মত সমান অধিকার এবং তা রাজনীতির ক্ষেত্রেও। আওয়ামীলীগ যেমন অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে তেমনি নর নারীর সমান অধিকারেও বিশ্বাস করে। আওয়ামীলীগেও নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা দরকার।”
বঙ্গবন্ধু নারীর ক্ষমতায়নের যে ভিত স্থাপন করেছিলেন তার পথ ধরেই এগিয়ে যাচ্ছেন আজকের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আজ বাংলাদেশ সারা বিশ্বে নারীর ক্ষমতায়নের রোল মডেলে পরিণত হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়নের বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করে চলেছেন তার সুযোগ্যা কন্যা শেখ হাসিনা।
বঙ্গবন্ধুর শৈশব থেকেই এই স্বপ্নের সাথী হয়েছেন বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব। খুব অল্প বয়সেই তাঁর চাচাতো বোন ফজিলাতুন নেছার সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। একটি স্বাধীন দেশের জন্মের পেছনে বঙ্গবন্ধুর নামের সঙ্গে যে নামটি উচ্চারিত হয় তা হচ্ছে ফজিলাতুন নেছা মুজিব। তিনি ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রতিটি কাজের প্রেরণার উৎস। তিনি পর্দার অন্তরালে থেকে নিয়মিত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা জুগিয়েছেন।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান মনেপ্রাণে নারী-পুরুষের সমঅধিকারে বিশ্বাস করতেন। নারী-পুরুষ সমানভাবে এগিয়ে না এলে কোনো দেশের উন্নতি সম্ভব নয় তিনি তা উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন। ‘আমার দেখা নয়াচীন’ গ্রন্থে তিনি লিখেছেন- ‘নয়াচীনের মেয়েরা আজকাল জমিতে, ফ্যাক্টরিতে কল-কারখানাতে, সৈন্যবাহিনীতে দলে দলে যোগদান করছে। সত্য কথা বলতে গেলে, একটা জাতির অর্ধেক জনসাধারণ যদি ঘরের কোণে বসে শুধু বংশবৃদ্ধির কাজ ছাড়া আর কোনো কাজ না করে তা হলে সেই জাতি দুনিয়ায় কোনো দিন বড় হতে পারে না। নয়াচীনে পুরুষ ও নারীর সমান অধিকার কায়েম হওয়াতে আজ আর পুরুষ জাতি অন্যায় ব্যবহার করতে পারে না নারী জাতির ওপর।’ তিনি আরও লিখেন, ‘নয়াচীনের উন্নতির প্রধান কারণ পুরুষ ও মহিলা আজ সমানভাবে এগিয়ে এসেছে দেশের কাজে। সমানভাবে সাড়া দিয়েছে জাতি গঠনমূলক কাজে। তাই জাতি আজ এগিয়ে চলেছে উন্নতির দিকে।’ (আমার দেখা নয়াচীন, শেখ মুজিবুর রহমান, বাংলা একাডেমি)। কিন্তু এই গ্রন্থটি তিনি লিখেছিলেন ১৯৫৪ সালে কারাগারে বসে। তিনি তখন রাজবন্দি। ১৯৫২ সালের অক্টোবরে এশীয় ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় আঞ্চলিক শান্তি সম্মেলনে যোগ দিতে চীনে গিয়েছিলেন। তিনি একজন তরুণ রাজনীতিবিদ স্বপ্ন দেখতেন নারী মুক্তির। পরবর্তীতে ক্ষমতায় এসে বাস্তবায়ন শুরু করেছিলেন।

বঙ্গবন্ধুর আহ্বানে ’৭১-এর স্বাধীনতা যুদ্ধে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অংশগ্রহণ করেছিল। নারী অস্ত্র হাতে যুদ্ধ করেছেন, যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের সেবা-শুশ্রুষা করেছেন, মুক্তিযোদ্ধাদের তথ্য সরবরাহ করে সহযোগিতা করেছেন, স্বামী-সন্তানকে যুদ্ধে পাঠিয়েছেন এবং লাখ লাখ মা-বোন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন,স্বাধীনতা অর্জনে তাদের অবদানও কোন অংশে কম নয়।
বঙ্গবন্ধু নারী মুক্তির যে স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়নের প্রথম ধাপ ১৯৭২-এর সংবিধান। সদ্য স্বাধীন দেশের সংবিধানে তিনি নারী-পুরুষের সমতার দিকে বিশেষ করে নজর দেন। আর এই সংবিধানের ওপর ভিত্তি করেই নারীর ক্ষমতায়নের নানা ক্ষেত্র তৈরি হয়। তবে এর আগে থেকেই বঙ্গবন্ধুর রাজনীতিতে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছিলেন। বদরুন্নেসা আহমেদ, আমেনা বেগম, জোহরা তাজউদ্দীন এই নামগুলো উল্লেখযোগ্য, যারা সরাসরি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে রাজনীতি করেছেন।

১৯৭২ সালে সংবিধানে নারীর ক্ষমতায়নের ভিত রচিত হয়। অনুচ্ছেদ ২৭-এ বলা আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ অনুচ্ছেদ ২৮ এ আছে-
১. ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারী পুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’

২. ‘রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’

আবার যেহেতু নারী পিছিয়ে পড়া সমাজের অংশ সেখানে নারীর জন্য বিশেষ ব্যবস্থা সংবিধানে রাখা হয়েছে। ২৮ অনুচ্ছেদের ৪ উপধারায় বলা আছে, ‘নারী বা শিশুদের অনুকূলে কিংবা নাগরিকদের যে কোন অনগ্রসর অংশের অগ্রগতির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন হইতে এই অনুচ্ছেদের কোন কিছুই রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করিবে না।’

সমাজে নারীর অংশগ্রহণ এবং সুযোগ বাড়ানোর জন্য ’৭২ সালেই বঙ্গবন্ধু সরকার সরকারি চাকরি ক্ষেত্রে ১০ ভাগ কোটা সংরক্ষণ করেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের আমলে নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশের জন্য সংবিধানের ৬৫(৩) অনুচ্ছেদে নারীর জন্য জাতীয় সংসদের আসন সংরক্ষিত রাখা হয়েছে। এই সংরক্ষিত আসনে প্রথমে ১৫ জন নারী সদস্য নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও বর্তমানে পর্যায়ক্রমে তা বৃদ্ধি পেয়ে ৫০ জনে উন্নীত হয়েছে। সংরক্ষিত আসনের ব্যবস্থা থাকলেও ৬৫(২) অনুচ্ছেদের অধীনে প্রত্যক্ষভাবে নির্বাচিত ৩০০ আসনেও নারীর অংশগ্রহণে সমান সুযোগ রয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীদের মর্যাদার আসনে বসান বঙ্গবন্ধু। পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে পাশবিকতার শিকার নারীদের যুদ্ধের পর এই সমাজ, পরিবার গ্রহণ করতে চাইল না। বঙ্গবন্ধু তাদের সম্মানিত করলেন ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধি দিয়ে। ১৯৭২ সালে বন্যা প্রতিরোধক বাঁধ নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করতে বঙ্গবন্ধু পাবনার বেড়া উপজেলার বসন্তপুর গ্রামে যান। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কয়েকজন নারী বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করার জন্য নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে বাকবিতন্ডায় জড়িয়ে পড়েন। বঙ্গবন্ধুর নজরে বিষয়টি এলে তিনি ওই নারীদের আসতে দেওয়ার জন্য নিরাপত্তাকর্মীদের আদেশ দেন। অনুমতি পেয়ে ওই নারীরা বঙ্গবন্ধুর কাছে ছুটে আসেন। তাঁরা মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তান সামরিক বাহিনী ও তাদের দোসরদের হাতে নির্যাতিত হওয়ার ভয়ঙ্কর সব ঘটনার কথা বলেন। তারা বঙ্গবন্ধুকে জানান, তাদের দুর্দশার কাহিনি, স্বাধীন দেশে নিগৃহীত এবং আশ্রয়হীন হওয়ার কথা। বঙ্গবন্ধুর চোখ ভিজে যায়। তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তাদের পুনর্বাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের আদেশ দেন বঙ্গবন্ধু। পরে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের বক্তৃতায় বঙ্গবন্ধু বলেন, “আজ থেকে পাকবাহিনীর দ্বারা নির্যাতিতা মহিলারা সাধারণ মহিলা নয়, তারা এখন থেকে ‘বীরাঙ্গনা’ খেতাবে ভূষিত। কেননা দেশের জন্যই তারা ইজ্জত দিয়েছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের চেয়ে তাদের অবদান কম নয় বরং কয়েক ধাপ উপরে, যা আপনারা সবাই জানেন, বুঝিয়ে বলতে হবে না। তাই তাদের বীরাঙ্গনার মর্যাদা দিতে হবে এবং যথারীতি সম্মান দেখাতে হবে। আর সেই সব স্বামী বা পিতাদের উদ্দেশে আমি বলছি যে, আপনারাও ধন্য। কেননা এ ধরনের ত্যাগী ও মহৎ স্ত্রীর স্বামী বা পিতা হয়েছেন। তোমরা বীরাঙ্গনা, তোমরা আমাদের মা।” মুক্তিযুদ্ধে নির্যাতিত নারীরা সেদিন থেকে ‘বীরাঙ্গনা’ উপাধিতে ভূষিত হন।

বঙ্গবন্ধু প্রথম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (১৯৭৩-১৯৭৮) স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের বিষয়টি প্রাধান্য দেন। তাদের জন্য শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজকল্যাণমূলক কিছু কর্মসূচি গৃহীত হয়। শহীদের স্ত্রী ও কন্যাদের জন্য চাকরি, ভাতার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বর্বর সেনাবাহিনী ও তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে নির্যাতিত নারীর গর্ভে অনেক যুদ্ধশিশুর জন্ম হলো। তাদের পরিচয় দেওয়ার মতো কোনো কিছু ছিল না। সমাজ গ্রহণ করতে চাইল না। বিশাল হৃদয়ের বঙ্গবন্ধু বললেন, তাদের পিতার নাম শেখ মুজিব। জাতীয় মহিলা সংস্থায় এক ভাষণে বঙ্গবন্ধু বললেন, “আজ থেকে ধর্ষিতা মেয়ের বাবার নামের জায়গায় লিখে দাও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। আর ঠিকানা লেখ ধানমন্ডি ৩২। মুক্তিযুদ্ধে আমার মেয়েরা যা দিয়েছে সেই ঋণ আমি কীভাবে শোধ করব?”

তিনি ওই সব নির্যাতিত নারীর পুনর্বাসনের জন্য ১৯৭২ সালেই গঠন করেন ‘নারী পুনর্বাসন বোর্ড’। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তারা দিনরাত পরিশ্রম করে খুঁজে খুঁজে বের করে নির্যাতনের শিকার নারীদের তালিকা করেন। তাদের জন্য বিভিন্ন বৃত্তিমূলক কাজের এবং পারিবারিক ও সামাজিকভাবে তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেন। অধ্যাপক নীলিমা ইব্রাহিম, অ্যাডভোকেট মমতাজ বেগমের মতো তৎকালীন ১১ জন প্রখ্যাত শিক্ষক-নারী নেত্রী ও রাজনৈতিক কর্মী ওই বোর্ডের সদস্য ছিলেন। নির্যাতিত বিপুলসংখ্যক নারীর পুনর্বাসনে এই বোর্ড অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে। এই সময়ে বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের প্রচেষ্টায় ১০ জন বীরাঙ্গনা নারীকে বিবাহ দেওয়া হয়েছিল।

এদিকে যুদ্ধশিশুদের গ্রহণে প্রস্তুত ছিল না সদ্য স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশের মানুষ। মায়েদের পক্ষে সম্ভব ছিল না শিশুদের লালন-পালনের ব্যবস্থা করা। তাই, বিদেশে যুদ্ধশিশুদের দত্তকের ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বাংলাদেশের পরিবার পরিকল্পনা সমিতি, বাংলাদেশ সেন্ট্রাল অর্গানাইজেশন ফর রিহ্যাবিলিটেশন, মাদার তেরেসার মিশনারিজ অব চ্যারিটির মাধ্যমে বহু যুদ্ধশিশুকে বিদেশে দত্তক দেওয়া হয়। তবে দত্তক হয়নি এমন শিশুদের বিভিন্ন শিশুসদনে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হয়।

জাতির পিতা নারীর রাজনৈতিক ক্ষমতায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে ভেবেছেন। ১৯৭৩ সালে তিনি মন্ত্রিসভায় দুজন নারীকে অন্তর্ভুক্ত করেন। তারা ছিলেন শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে অধ্যক্ষ বদরুন্নেসা আহমেদ এবং সমাজকল্যাণে বেগম নূরজাহান মুরশিদ। সে সময় বঙ্গবন্ধু বললেন, “নারীদেরও পুরুষদের মতো সমান অধিকার এবং তা রাজনীতির ক্ষেত্রেও। আওয়ামী লীগ যেমন অসাম্প্রদায়িকতায় বিশ্বাস করে তেমনি নর-নারীর সমান অধিকারেও বিশ্বাস করে। আওয়ামী লীগেও নারী নেতৃত্ব গড়ে তোলা দরকার।”

১৯৭৪ সালে নারী উন্নয়ন বোর্ডকে পুনর্গঠন করে সংসদে অ্যাক্টের মাধ্যমে নারী পুনর্বাসন ও কল্যাণ ফাউন্ডেশনে রূপান্তর করা হয়। এই ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের পথটি তৈরি হয়। এই সময় নারী উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গৃহীত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-

১. জেলা ও থানা পর্যায়ে ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা।

২. বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে নারীর ব্যাপক কর্মসংস্থানের পথ প্রশস্ত করা।

৩. নারীকে উৎপাদনমুখী কর্মকান্ডে নিয়োজিত করে তাদের পণ্যের বিক্রয় ও প্রদর্শনীর ব্যবস্থা এবং দিবাযত্ন কেন্দ্র চালু করা।

৪. ক্ষতিগ্রস্ত নারীদের চিকিৎসাসেবা চালু করা এবং তাদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য বৃত্তিপ্রথা চালু। এটি বর্তমানে মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের আওতায় ‘দুঃস্থ’ মহিলা ও ‘শিশুকল্যাণ তহবিল’ নামে পরিচালিত হচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন, নারীর সামাজিক সম্মান ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার গুরুত্ব। ব্যক্তিজীবনেও তিনি বেগম মুজিবকে অত্যন্ত সম্মানের চোখে দেখতেন। বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিবের নানা পরামর্শ অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৬ মার্চ ১৯৭২, রাজধানীর আজিমপুর বালিকা বিদ্যালয়ে মহিলা ক্রীড়া সংস্থার অনুষ্ঠানে বলেন, “আমার জীবনেও আমি দেখেছি যে গুলির সামনে আমি এগিয়ে গেলেও কোনো দিন আমার স্ত্রী আমাকে বাধা দেয় নাই। এমনও আমি দেখেছি যে, অনেকবার আমার জীবনের ১০/১১ বছর আমি জেল খেটেছি। জীবনে কোনো দিন মুখ খুলে আমার ওপর প্রতিবাদ করে নাই। তাহলে বোধ হয় জীবনে অনেক বাধা আমার আসত। এমন সময়ও আমি দেখেছি যে আমি যখন জেলে চলে গেছি, আমি এক আনা পয়সা দিয়ে যেতে পারি নাই আমার ছেলেমেয়ের কাছে। আমার সংগ্রামে তার দান যথেষ্ট রয়েছে। পুরুষের নাম ইতিহাসে লেখা হয়। মহিলার নাম বেশি ইতিহাসে লেখা হয় না। সে জন্য আজকে আপনাদের কাছে কিছু ব্যক্তিগত কথা বললাম। যাতে পুরুষ ভাইরা আমার, যখন কোনো রকমের সংগ্রাম করে নেতা হন বা দেশের কর্ণধার হন তাদের মনে রাখা উচিত, তাদের মহিলাদেরও যথেষ্ট দান রয়েছে এবং তাদের স্থান তাদের দিতে হবে।” তিনি বাংলাদেশে প্রথম নারী সংগঠন জাতীয় মহিলা সংস্থার ভিত্তি রচনা করেন।
বঙ্গবন্ধু নারীর সার্বিক উন্নয়ন ও তাদের অবস্থার পরিবর্তনের লক্ষ্যে একটি সাংগঠনিক কাঠামো তৈরির জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশ দেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গঠিত হয় জাতীয় মহিলা সংস্থা।

বঙ্গবন্ধু নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের ওপর জোর দিয়ে বলতেন, নারীর নিজস্ব আয় থাকলে পরিবারেও সম্মান বাড়ে। যদি তার সামান্য কিছু টাকাও থাকে পরিবারে তার গুরুত্ব বাড়ে এবং পরিবার তাকে সম্মানের চোখে দেখে। বঙ্গবন্ধু উপলব্ধি করেছিলেন পরিবার থেকেই নারীর ক্ষমতায়ন শুরু করতে হবে। নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতার জন্য তার উপার্জনের লক্ষ্যে স্বাধীনতার পর নারীকে অর্থনৈতিক কর্মকান্ডে সম্পৃক্ত করার জন্য প্রয়োজন হয়ে পড়ে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের। এই প্রেক্ষাপটে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে চালু করা হয় বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি। গ্রামীণ নারীরা কৃষিকাজে যুক্ত ছিলেন বলেই তাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে কৃষিকাজে সম্পৃক্ত করার কথা ভাবেন। এই লক্ষ্যে ১৯৭৩ সালে সাভারে মহিলা বিষয়ক অধিদফতরের ৩৩ বিঘা জমির ওপর চালু করা হয় কৃষিভিত্তিক কর্মসূচি। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক মুক্তির মূল ভিত্তি নারীর শিক্ষা। নারী শিক্ষায় গুরুত্ব দিয়ে জাতির পিতা নারীর জন্য চালু করেন স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের অধীনে গণশিক্ষা কার্যক্রম। নারীরা ব্যাপকভাবে এতে অংশ নেন।

জাতির পিতা ১৯৭২ সালের সংবিধানেই নারীকে শিক্ষিত ও দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার যে উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন তারই ধারাবাহিকতা চলছে। সরকারের জাতীয় উন্নয়ন কর্মকান্ড বাস্তবায়নে নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নারীর রাজনৈতিক, সামাজিক, প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করার কাজ এগিয়ে চলেছে। বাংলাদেশে সব ক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ছে। সংবিধানের ৯ অনুচ্ছেদের অধীনে স্থানীয় শাসন সংক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়নে নারীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা হচ্ছে। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নারীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব বিকাশে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশনের আইনগুলো যুগোপযোগী করে সরাসরি নির্বাচনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জাতীয় সংসদে সংসদীয় কমিটির প্রত্যেকটিতে নারী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ১৯৯৭ সালে স্থানীয় সরকার আইনে সাধারণ আসনে নারী প্রার্থীর অধিকার ঠিক রেখে প্রতি ইউনিয়নে তিনটি সংরক্ষিত আসনে সরাসরি নির্বাচনের বিধান করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এর ফলে তৃণমূলে নারীর ক্ষমতায়নের পথ সুগম হয়। উপজেলা পরিষদে নারী ভাইস চেয়ারম্যানের পদ সৃষ্টি করা হয়। সেখানে তারা সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হয়ে আসেন। ২০১৩ সালে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী স্পিকার হিসেবে নির্বাচিত হয়ে পরপর তৃতীয়বারের মতো স্পিকারের দায়িত্ব পালন করছেন।

১৯৭৯ সালে জাতিসংঘে নারীর প্রতি সব ধরনের বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গৃহীত হয়। বাংলাদেশ সরকার সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপের লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে। সিডও সনদের বহু আগেই ১৯৭২ সালে জাতির পিতা বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষের সমঅধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছেন। তারই সুযোগ্য কন্যা তা সর্বস্তরে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নিরলস কাজ করে যাচ্ছেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক আদর্শ ও প্রজ্ঞায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি বাবার অসমাপ্ত কাজ শেষ করার দায়িত্ব গ্রহণ করেন। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১০ সালে সন্তানের পরিচয়ে মায়ের নাম যুক্ত করে নারীর মর্যাদায় যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছেন। আজ জীবনের সর্বস্তরে নারীর পদচারণা অত্যন্ত দাপটের সঙ্গে বাড়ছে।

আজ জাতীয় ও সামাজিক স্তরের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারী নেতৃত্ব দিচ্ছেন। নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক সূচকের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সমতা বজায় রাখার উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ-২০১৮-এর প্রতিবেদনে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে জেন্ডার সমতায় বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই প্রতিবেদনে পৃথিবীর ১৪৪টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের ৪৮ নম্বরে, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, ভারত, মালদ্বীপ, ভুটান ও পাকিস্তানের স্থান যথাক্রমে ১০০, ১০৫, ১০৮, ১১৩, ১২২ ও ১৪৮। বিশ্বের অনেক উন্নত দেশের চেয়েও বাংলাদেশের অবস্থান ওপরে। আমেরিকা, ইতালি, রাশিয়া ও চীনের অবস্থান যথাক্রমে ৫১, ৭০, ৭৫ ও ১০৩।

নারীরা এখন বিচারপতি, জেলা প্রশাসক ও পুলিশের উচ্চপদে দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমানে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে সচিব হিসেবে বেশ কয়েকজন নারী কর্মরত আছেন। বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে, বিমান বাহিনীতে, নৌবাহিনীতে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নারী কাজ করছেন। সরকার কর্মক্ষেত্রে নারীর অন্তর্ভুক্তি উৎসাহিত করছে। পোশাকশিল্পে নারী বিপ্লব সাধন করেছে। পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশ দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে। যার সাফল্যের অংশীদার মূলত নারী। দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশই প্রাথমিক শিক্ষায় নারী-পুরুষের সমতা অর্জন করেছে।

নারীর নিরাপত্তা বিধানে সরকার ‘পারিবারিক সহিংসতা (দমন এবং নিরাপত্তা) আইন ২০১০’ প্রণয়ন করা হয়েছে যার মাধ্যমে প্রথমবারের মতো পারিবারিক নির্যাতনকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে। এ আইনকে বাস্তবায়নে সহায়তা করার জন্য ২০১৩ সালে পারিবারিক সহিংসতা (দমন এবং নিরাপত্তা) বিধি প্রণয়ন করা হয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সম্প্রতি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ আইন কঠিন শাস্তির বিধান রেখে সংস্কার করা হয়েছে।

নারীর উন্নয়নে, ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ সরকার ভালো ভালো উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। দৃশ্যমান অনেক পরিবর্তন হয়েছে। তবে এখনও বন্ধ হয়নি নারীর প্রতি সহিংসতা। এখনো নারী ঘরে বাইরে নির্যাতিত হচ্ছে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় এখনো নারী ধর্ষণের শিকার হচ্ছে। কর্মক্ষেত্রে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, গণপরিবহনে, এমনকি রাস্তাঘাটে নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন হয় নাই। এখনো নারীকে দেখা হয় পুরুষের অধস্তন হিসেবে। এখনো সবক্ষেত্রে অর্জিত হয়নি নারী পুরুষের সমতা। বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা কাজ করে যাচ্ছেন নিরলসভাবে । কিন্তু ঘুণে ধরা এই সমাজ পরিবর্তনে আমাদের যেতে হবে আরও বহুদূর। জাতির পিতার স্বপ্ন সেদিন সার্থক হবে যেদিন জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত হবে নারী-পুরুষের সমতা আর একটিও নারী নির্যাতনের ঘটনা ঘটবে না।

লেখক : সাধারণ সম্পাদক, জাতীয় প্রেস ক্লাব
সদস্য, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উদযাপন জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close