ফেসবুক থেকে

স্পেনের গ্রান্ড ক্যানারী দ্বীপপুঞ্জের রহস্যময় রাজ্যে

নাজমুন নাহার
আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ এখন পৃথিবীর ভ্রমণের স্মৃতি। গচ্ছিত টাকা নেই, পয়সা নেই, সম্পদ নেই। আছে শুধু স্মৃতির ক্যানভাস জুড়ে বাংলাদেশের পতাকা নিয়ে পৃথিবী ভ্রমণের হাজারো গচ্ছিত গল্প।

জীবনের যা কিছু উপার্জন সবকিছু এই পৃথিবীকে দেখতে দেখতেই খরচ করেছি। তাও আবার কত গবেষণা, কত কষ্ট করতে হয়েছে- কিভাবে কোথায় কত কম খরচে যাওয়া যাবে। কখনো কখনো অপেক্ষা করতাম লাস্ট মিনিট টিকিটের জন্য। ভাগ্য ভালো হলে পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টার প্লেনের জার্নির টিকিট হয়তো ১৫ কিংবা ২০ ডলার মিলে যেত। ভাগ্যবশত তেমনি করে এই দ্বীপপুঞ্জে যাওয়ার জন্য একটা লাস্ট মিনিট টিকেট পেয়েছিলাম যেটি ছিল মাত্র ২০ ডলারে সুইডেন থেকে স্পেনের গ্র্যান্ড ক্যানারি দ্বীপে। যেখানে প্লেনে যেতে আকাশ পথে পাঁচ ঘণ্টা জার্নি করতে হয়েছিল।

এই অভিযাত্রার ক্যানভাস জুড়ে আছে আটলান্টিক মহাসাগরের গভীর সমুদ্রের স্পেনের মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপ রাজ্যে হারিয়ে যাওয়ার স্মৃতিকথা।
২০১৮ সালের অক্টোবর মাস, আমি তখন সুইডেন থেকে গ্র্যান্ড ক্যানিরিয়া দ্বীপে পৌঁছেছি। সড়কপথে পুরো পশ্চিম আফ্রিকা সফরের উদ্দেশ্যে ইউরোপ থেকে এই দ্বীপে এসে নেমেছিলাম। এই গ্র্যান্ড ক্যানারী দ্বীপ থেকে পশ্চিম আফ্রিকার মৌরিতানিয়া গিয়েছিলাম ১২০ ডলারে। সুইডেন থেকে পশ্চিম আফ্রিকার মৌরিতানিয়া সরাসরি যেতে লাগতো ৬০০ ডলার। আমি ম্যাপের উপর রিসার্চ করে বের করেছি কিভাবে কোন পথে পশ্চিম আফ্রিকাতে কম খরচে যেতে পারবো । আর সেই গবেষণার ফলস্বরূপ আমি মাত্র ১৪০ ডলারে সুইডেন থেকে পশ্চিম আফ্রিকার শুরুর উত্তর-পশ্চিমের দেশ মৌরিতানিয়ায় পৌঁছেছি।

সাহারা মরুভূমির কাছাকাছি সমুদ্রের মধ্যে গ্র্যান্ড ক্যানারিয়া থেকে মাত্র আড়াই ঘন্টা পার হয়ে মৌরিতানিয়ার নোয়াকচট্ যাওয়ার উদ্দেশ্যে এটা ছিল আমার চারদিনের ট্রানজিট পয়েন্ট। পশ্চিম আফ্রিকায় ৪ মাসের ১৫ দেশের দীর্ঘ জার্নির শুরুতেই এমন একটি দ্বীপে কয়েকদিন থেকে আমি রওনা হয়েছিলাম সেই ভঙ্গুর পথে অভিযাত্রার জন্য।
গ্র্যান্ড ক্যানারিয়া দ্বীপ স্পেনের নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের মধ্যে অবস্থিত নয়, এটি মূল স্পেন থেকে বিচ্ছিন্ন আফ্রিকা মহাদেশের পশ্চিমে মরক্কো এবং মৌরিতানিয়ার অনতিদূরে আটলান্টিক মহাসমুদ্রের মধ্যে অবস্থিত।

সেই দ্বীপে প্লেন থেকে নামার আগের মুহূর্তে যখন আকাশ থেকে নিচে তাকালাম তখন মনে হল বিশাল সমুদ্রের বুকে ক্ষুদ্র এক খন্ড জমিনের উপর প্লেনটা আস্তে আস্তে ল্যান্ড করলো। এই দ্বীপে জুন-জুলাই মাসে প্রচন্ড তাপমাত্রা থাকে, যেটা সহ্য করা মুশকিল। কিন্তু আমি যখন গিয়েছি তখন অক্টোবরের আনন্দদায়ক সামুদ্রিক হাওয়া বইছিল চারদিকে, সমুদ্রের পাড় ঘেঁষে যখনই হাঁটতাম সামুদ্রিক বাতাস এসে শরীর জুড়িয়ে দিতো।

চারদিনে যতটুকু পেরেছি এই দ্বীপের অজানা রহস্যকে খুঁজে খুঁজে দেখেছি। সমুদ্রের পাড়ে বসে মেডিটেশন করে মানসিক শক্তি সঞ্চয় করেছি। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত হেঁটে হেঁটে দ্বীপের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান জায়গা গুলো দেখেছি। চারিদিকে সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ, কোথাও পাহাড়ের ছোট ছোট টিলা আবার টিলার পাশ ঘেঁষে বয়ে যাওয়া দ্বীপের ঘরবাড়ি, রাস্তায় হাঁটলে কেমন যেন ভিন্ন পরিবেশ, কোন কোন রাস্তার গুলিতে নিস্তব্ধ দুপুরের সুনসান নীরবতা, রাস্তার গলির শেষ মাথা জুড়ে হয়ত পাহাড়ের কোনটির উঁচু হয়ে ওয়াকিং স্ট্রিটের শোভাবর্ধন করেছে।

বিকেলের নরম আলোর ছটা পড়ে এই দ্বীপের বিভিন্ন সমুদ্র আর পাহাড়ে ঘেরা সৈকতগুলি উজ্জল সোনালী রং ধারণ করতো। সন্ধ্যা হলে এর রাজধানী লাস পালমায় যখন চাঁদ উঠতো, সন্ধ্যায় সমুদ্রের কোল ঘেঁষে এসে পড়তো সেই চাঁদের আলো সমুদ্রের ঢেউয়ের উপর এক অপূর্ব আভা তৈরি করতো। সমুদ্রের ঢেউ, চাঁদের আলো সব মিলিয়ে এই দ্বীপের চার দিনের সন্ধ্যা আমাকে মুগ্ধ করেছিলো অনেক। আবার সমুদ্রের কোনায় কোথাও কোথাও মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মাঝারি পর্বত শৃঙ্গ। সব মিলিয়ে গ্র্যান্ড ক্যানারিয়া পৃথিবীর আশ্চর্যতম সৌন্দর্যের এক অপূর্ব দ্বীপ।

এভাবে আমি খুব কম খরচে পৃথিবীর বিভিন্ন মহাদেশ দেখার জন্য অধ্যবসায় করেছি, গবেষণা, চেষ্টা, পরিশ্রম এবং সেই রুটের ম্যাপের উপর পড়াশোনা করেছি। ইবনে বতুতা যখন ভ্রমণ করেছিলেন ওই শতাব্দীতে জীবন ছিলো আরো অনেক কঠিন। অনেক কষ্ট করে তিনি পৃথিবীর অনেক স্থানে পা রেখেছিলেন শুধু তার চেষ্টাকে সঙ্গী করে। কারণ আসলেই যে পৃথিবী দেখতে চায়, যারা ভ্রমণ করতে চায় তারা একবার যখন পৃথিবীতে নেমে পড়বেন, তাঁর আগে যখন সেই দেশের উপর সেই পথের ম্যাপ নিয়ে, সেই সীমান্তের উপর পড়াশোনা করবেন তখনই বের হয়ে যাবে কিভাবে কম খরচে পৃথিবী ভ্রমণ করতে পারবেন।

লেখক : বাংলাদেশের পতাকাবাহী প্রথম বিশ্বজয়ী পরিব্রাজক, ১৪০ দেশ ভ্রমণকারি

সামি/২৭/৭/২২.১০

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close