লাইফ স্টাইল

গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণ যে বিষয়গুলো জেনে রাখা ভালো

আছিয়া পারভীন আলী শম্পা

গর্ভধারণ যেকোনো নারীর জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এ মুহূর্তে যেসব মা গর্ভধারণ করেছেন তাদের আনন্দের পাশাপাশি উদ্বেগ ও কম নয়। আর সেই উদ্বেগ দ্বিগুণ হয়ে যায় যখন হুট করে মা জানতে পারেন তিনি গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত। একজন মা গর্ভবস্থার একদম শুরুতে কিংবা ৫ মাসের পর গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। গর্ভবতী মা যদি কিছু বিষয়ে সচেতন থাকেন তবে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ে খুব বেশি চিন্তার কিছু নেই।

– সাধারণত, অপুষ্টি, মায়ের ওজন আগে থেকেই বেশি থাকলে, অলস জীবনযাপন, ত্রিশ বছরের বেশি বয়সে গর্ভধারণ, প্রি-ডায়াবেটিস, আগের গর্ভধারণে ডায়াবেটিসে থাকলে, পরিবারে ডায়াবেটিসের ইতিহাস, হরমোন প্রভৃতি কারণে একজন গর্ভবতী মা গর্ভকালীন ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হতে পারেন। সন্তান প্রসবের পর অধিকাংশ মায়ের ক্ষেত্রেই ডায়াবেটিস এমনিতেই চলে যায়।

– গর্ভকালীন ডায়াবেটিস যদি নিয়ন্ত্রণে না থাকে গর্ভস্থ সন্তানের আকার বড় হওয়া, অপরিণত শিশু জন্ম নেয়া, রক্তচাপ বেড়ে গিয়ে একলাম্পশিয়া বা বার বার যেকোনো ধরনের ইনফেকশন হওয়া, ডেলিভারির পর সন্তান পর্যাপ্ত বুকের দুধ না পাওয়া বা মৃত সন্তান প্রসব হওয়ার মতো সম্ভাবনা থাকে। তাই শুরু থেকে সচেতন থাকলে পরবর্তীতে যেকোনো জটিলতা এড়ানো সম্ভব।

– আশার বিষয় হলো, শুধু সঠিক এবং সুষম খাদ্যাভ্যাস এবং যতটুকু সম্ভব হাঁটা-চলার মাধ্যমে আপনি গর্ভকালীন ডায়াবেটিস ৯৯.৯৯% নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেন। সেক্ষেত্রে আপনার ইনসুলিন বা মেডিসিন নাও লাগতে পারে। আর এক্ষেত্রে, একজন পুষ্টিবিদের সাহায্য নিলে সবচেয়ে ভালো হয়।

– যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস শনাক্ত হয়েছে তাদের রক্তের শর্করা খালি পেটে ৫.৩ মিলিমোল/লিটার এবং খাওয়ার ২ ঘণ্টা পর ৬.৭ এর নিচে থাকা বাঞ্ছ্যনীয়। সপ্তাহে অন্তত ২ দিন ঘরে বসে রক্তের শর্করা মাপা উচিত।

– যেকোনো ধরনের ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে, সময় মতো এবং সঠিক পরিমাণে খাবার গ্রহণ করার কোনো বিকল্প নেই। একবারে অনেক বেশি খাবার না খেয়ে সারাদিনের খাবারকে অন্তত ৫-৬ বার গ্রহণ করা উচিত। পরিমিত শর্করা জাতীয় খাবার, হেলদি ফ্যাট, পর্যাপ্ত প্রোটিন জাতীয় খাবার, শাকসবজি এবং মিক্স ফলের সমন্বয় থাকা উচিত খাদ্য তালিকায়।

– যেসব মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রয়েছে, তাদের উচিত শর্করা জাতীয় খাবার যেমন- ভাত, রুটি, মুড়ি, খই, ওটস, চিড়া, আলু, নুডলস বা পাস্তা এ ধরনের খাবার ঠিক যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু গ্রহণ করা।

– একজন গর্ভবতী মায়ের জন্য বড় মিলগুলোতে ৩০-৩৫ গ্রাম শর্করা জাতীয় খাবারই যথেষ্ট। আর এই পরিমাণটা কার জন্য কি পরিমাণ হবে- তা নির্ধারিত হবে, একজন মায়ের ওজন, উচ্চতা, শারীরিক অবস্থা, দেহে কোনো ধরনের অপুষ্টি আছে কিনা, পরিশ্রমের ধরন এবং রক্তের সুগার লেভেলের অবস্থা বুঝে।

– প্রতি ৬০ গ্রাম বা ১/২ কাপ ভাত, ৩০ গ্রামের প্রতিটি রুটি, ২২ গ্রাম মুড়ি, খই বা চিড়াতে পাবেন ১৫ গ্রাম শর্করা। সুতরাং বুঝতেই পারছেন মাত্র ১ কাপ ভাত বা ২ পিস রুটি থেকেই ৩০ গ্রাম শর্করা পাওয়া যাবে। এ ছাড়া ফল, দুধ, ফলের রস, দই এবং অন্যান্য অনেক খাবারেও শর্করা থাকে। তাই গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য অতিরিক্ত শর্করা জাতীয় খাবার পরিহার করার কোনো বিকল্প নেই।

– যেসব মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস আছে তাদের বাড়তি ক্যালরি চাহিদা পূরণের জন্য প্রতি বেলায় শর্করা জাতীয় খাবার পরিমিত রেখে প্রোটিন জাতীয় খাবার যোগ করা উচিত।

– গর্ভকালীন সময়ে ফাইবারের চাহিদা এবং রক্তের শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রতিদিন অন্তত ৪০০ গ্রাম ফল ও শাকসবজি গ্রহণ করা উচিত।

– যেসব ফল অতিরিক্ত মিষ্টি সেই ফলগুলো কম পরিমাণে খাওয়া উচিত এবং খেলেও দিনের বেলায় খাওয়া উচিত।

– অনেকেই, ভাবেন গর্ভকালীন ডায়াবেটিস হলে হয়তো ডাবের পানি খাওয়া যাবে না। যাদের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস রয়েছে তারাও প্রতিদিন ১ গ্লাস বা ২০০ এম.এল. কচি ডাবের পানি খেতে পারবেন।

– ছোট মিলগুলোর যেকোনো একটিতে রাখতে পারেন ৩০ গ্রাম মিক্স বাদাম। এ ছাড়া টক ফল বা মিক্স ফল সাথে টকদই ও খেতে পারেন স্নাক্সগুলোয়।

– নিয়মিত স্বাভাবিক শারীরিক পরিশ্রম, কাজকর্ম বা ব্যায়াম করলে গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং নরমাল ডেলিভারির সম্ভাবনা দুটোই বৃদ্ধি পায়। তাই, যাদের হাঁটা-চলায় ডাক্তারের মানা নেই তারা প্রতিদিন অন্তত ৩০ মিনিট হালকা ব্যায়াম বা হাঁটাহাঁটি করতে পারেন।

– যদি, একজন মায়ের গর্ভকালীন ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে না থাকে তবে ফার্স্টলাইন ট্রিটমেন্ট হিসেবে ইনসুলিন নিতে বলা হয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে মেডিসিনও ব্যবহার করা হয়। মেডিসিনের চেয়ে ইনসুলিন বেশি নিরাপদ। তাই ডাক্তার আপনাকে ইনসুলিন নিতে বললে ভয়ের কোনো কারণ নেই।

লেখক : পুষ্টিবিদ, বেক্সিমকো ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close