মতামত

আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত বাতিল করুন

নাদিম মাহমুদ

মোকলেছ আলী একজন রিকশা চালক, থাকেন ঢাকার এক বস্তিতে। তার স্ত্রী হালিমা গৃহকর্তীর কাজ করেন। তাদের তিন সন্তান রয়েছে। যাদের বয়স ১২ বছরের নীচে।

মোকলেছ আলী গত তিনদিন ধরে জ্বর, কাশিতে ভুগছেন আর তার স্ত্রী ও সন্তানরা একদিন আগে জ্বরের কবলে পড়ছে।

মোকছেদ আলী টেলিভিশনে শুনেছেন, যে জ্বর, কাশি করোনার লক্ষণ। আর এটা পরীক্ষার জন্য ৫০০ টাকা করে ফি দিতে হবে। মানে দাঁড়াচ্ছে, মোকছেদ আলীর পরিবারের কোভিড-১৯ পরীক্ষা করতে লাগবে ২৫০০ টাকা। দিনে আনে দিন খায় মোকছেদ আলীর এই টাকা জোগাড় করতে লাগবে রিকশা চালাতে হবে ৮ দিন।

এতো টাকা দেয়ার ক্ষমতা না থাকায় গরীবের সর্দি জ্বর নেই মনে করে পেটের তাগিদে মোকলেছ আলী শরীরে জ্বর নিয়ে রিকশা চালাতে বের হলেন। রিকশা বসলেন এক যাত্রী, যিনি একজন ব্যাংক কর্তা। তার স্ত্রীও পাশের বাসায় যে গৃহকর্তীর কাজ করেন, সেই বাসার কর্তা হলেন একজন শিল্পপতি।

মোকছেদ আলীর করোনা ব্যাংককর্তা বহন করে ব্যাংকে ছড়ালেন, আর তার স্ত্রী রান্না করতে গিয়ে শিল্পপতির ঘরে করোনা ছড়ালেন।
এই হলো বাস্তবতা।

আপনি যখন, কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের জন্য ফি ধার্য করবেন, তখন করোনা এইভাবে আপনাকে আঁকড়ে ধরবে। যে গরীব মানুষ খেতে পারছে না, সে তো টাকা খরচ করে বুথে যাবে না, চিকিৎসা করাবে না। আমাদের মত গরীব দেশে এই ধরনের চিন্তা আপাতত মহাপাপ।

কোভিড-১৯ কে আটকানোর জন্য বিশ্বের বিভিন্ন দেশ যখন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়ার ঝাঁপি খুলে বসছেন, আলিশান হোটেলে আইসোলেশনের ব্যবস্থা করছে, তখন আমাদের মত গরীব দেশে ফি ধার্য করে কার্যত কোভিড-১৯ শনাক্তকরণে নিরুৎসাহিত করার সামিল।

আমি জানি না, সরকার বিষয়টি কিভাবে দেখছে, তবে আমার মত ক্ষুদ্র মস্তিষ্কের মানুষ মনে করেছে, কোভিড-১৯ পরীক্ষার জন্য যদি ফি আরোপ করেন, তাহলে যারা করোনায় আক্রান্ত হয়েছেন, তারা তো যাবেন না, বরং তাদের মাধ্যমে দ্বিগুণ হারে কোভিড-১৯ ছড়িয়ে পড়বে তাতে কোন সন্দেহ নেই।

ধরুন, প্রতিদিন ২০ হাজার রোগীর করোনা শনাক্তকরণের পরীক্ষা হচ্ছে, প্রতিটি পরীক্ষায় যদি ২০০ টাকা করে ধরেন, তাহলে প্রতিদিন ৪০ লাখ টাকা। প্রতি মাসে লাগবে ১৩ কোটি টাকার মত। যদি আরো চার মাস এই পরীক্ষা করা হয়, তাহলে লাগবে ৫২ কোটি টাকার মত।

এই যে হাজার হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা দিচ্ছেন, সেইখান থেকে মাত্র ৫০ কোটি টাকা সরকারের খুব বেশি খরচ বলে আমার কাছে মনে হচ্ছে না। বরং যারা বছরের পর বছর দুর্নীতি করে টাকার পাহাড় গড়েছে, বাংলাদেশকে যারা রেমিটেন্স পাওয়ার উৎস মনে করে বিদেশে সম্পদ গড়ে তুলছে, তাদের যেকোন একজনকে যদি দুদক ধরে, তাহলে এই পঞ্চাশ কোটি কেন, হাজার কোটিতেও ফুরাবে না।

জনগণের জন্য সরকার। তাই তাদের টাকা তাদের এই ক্রান্তিলগ্নে কাজে লাগাবে এটাই স্বাভাবিক। আমি চাই, কোভিড-১৯ শনাক্তকরণের ফি নেয়ার জন্য সিদ্ধান্ত সরকার নিতে চলছে, সেটি বাতিল করা হোক। স্বাস্থ্যখাতে বার্ষিক যে বাজেট হয়েছে, সেই বাজেটের একটি বড় অংশ এখন ব্যয় হোক। মনে রাখবেন, আপনি যত বেশি শনাক্ত করে, রোগীদের আইসোলেশন করতে পারবেন, ততই আপনার আমার ঘর নিরাপদ থাকবে। নয়তো বা এই টাকা জমিয়ে আপনার কোন কাজে আসবে না। করোনার থাবায় সব দুমড়ে মুচড়ে যাবে।

(ফেসবুক থেকে)

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close