ফেসবুক থেকে

গাঁজাখুরি

মাহমুদ হাফিজ
ক্লাশ, সেমিনার, প্রশিক্ষণ, সরেজমিন পরিদর্শন, হাতে-কলমে শিক্ষার মাধ্যমে সার্টিফিকেট পাওয়ার কোর্স করছি। ফুলপেইড। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে। মার্কিন তন্বী-তরুণী অরলি শাওলিন কোর্স সহযোগি। ভরদুপুরে ওয়াশিংটনের ‘ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল এডুকেশন’-আইআইই থেকে বের হয়ে রাস্তায় এসে বলে ‘চলো পালিয়ে যাই, জীবন বদলে দেবো’।

চমকে উঠে বলি ‘এই মেয়ে, বলো কী’! পালিয়ে যাই মানে? আমার বউ বাচ্চা আছে দেশে, তারা প্রাণের অধিক। উন্নয়নশীল দেশকে উন্নতিতে বদলানোর লক্ষ্য সামনে রেখে মেধাশাণাতে এখানে এসেছি তাই বলে পালিয়ে যাওয়া ? এ কি কথা? (তখনো সুরজিৎদের ভূমি ব্যান্ড হয়নি কিংবা ‘আজ ফাগুণি পূর্ণিমা রাতে.. ..চল পলায়ে যাই’ বিখ্যাত হয়নি)।
উত্তর মেলে, এই বয়সে যুক্তরাষ্ট্রে এসে এশিয়ার কাউকে দেশে ফেরার কথা বলতে শুনিনি। তারওপর সঙ্গে তন্বীকে পেয়ে। তুমি আর কি ছাই মেধাবী! তোমারচে’ বড় বড়রা থেকে যাওয়ার ফোকর খোঁজে। বলি, দ্যাখো, থেকে গেলে আমার ছেলের বেড়ে ওঠা লাটে উঠতে পারে, স্ত্রী হাতছাড়া হওয়ার সম্ভাবনা। একদম নিরাশ না করে বলি-‘ দেখা যাক। ‘কোর্স তো শেষ হোক, সার্টিফিকেটটা হাতে পাই আগে’।

দু’জন রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছি।এক কালো মানুষ এসে অরলিকে বলে ‘ডু ইউ হ্যাভ চেঞ্জ? ইউ হ্যাভ টু গিমমি সাম চেঞ্জ’। আমি আগামাথা বুঝি না। ভাবি, অরলির কাছে টাকা ভাঙতি চাচ্ছে হয়তো। অরলি সাদা। কালো লোকটিকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দেয়ার ভঙ্গি করে। আমাকে চুপচাপ দেখে বলে, ‘ দ্যাখো এই লোক জোর করে ভিক্ষা চায়’। বললাম, তোমাদের উন্নত দেশে এরকম ভিক্ষুক আছে জানতাম না- বলে ম্যানিবাগ বের করে কিছু খুচরো ডলার দিই। বলি, এতো বদল বদল করছো…আমরা তো দারিদ্র্য উতরানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। পনেরো হাজার মাইল উড়াল দিয়ে এসেছি তোমাদের কাছে উন্নতির ছবক নিতে। শাওলিন আমাকে গায়ে ঠেলে বলে- কিছু থাকবেই- ওসব বাদ দাও, চলো নিজেদের জীবন পাল্টাই। বলি- বাদ দিলে হয় না। ওটা গুরুত্বপূর্ণ।

ওয়াশিংটন ডিসি’র প্রশস্ত রাস্তায় নিরন্তর দামি গাড়ি চলতে থাকে। আকাশে পাখি উড়ে পাশের পার্কে সবুজবৃক্ষশাখায় বসে। আমরা ইতিউতি ঘুরি। অরলি শক্ত করে ধরে থাকে আমার হাত। গায়ে গা লাগিয়ে হাঁটে। পশ্চিমা তরুণীর খোলামেলা পোশাকের পাশে এশিয়ার রক্ষণশীল যুবক আমি আড়ষ্ট হই। দেশের কথা মনে পড়ে, স্ত্রী-সন্তানের মুখ ভেসে ওঠে। আড়ষ্টতা আনমনায় রূপ নেয়। ক্লাশ, সেমিনার, সরেজমিন ভিজিট আর দিনমানের রুটিনের ফাঁকে ফাঁকে আমরা নিয়মিত বেরিয়ে পড়ি। ওয়াশিংটন ডিস্ট্রিক অব কলাম্বিয়ার এপার্ক ওপার্ক ঘুরি। জেফারসন মেমোরিয়াল স্টেশন থেকে পাতালরেলে চড়ে পেন্টাগন ঘুরে আসি। পটোম্যাক নদীর তীরে বসে বাদাম খাই। ক্যাপিটল হিল, হোয়াইট হাউজ, ওয়াশিংটন মনুমেন্ট, ওয়াশিংটন হারবারের রাস্তায় এশিয়ান-আমেরিকান চারটি পা থপ থপ করে দুর্বা ঘাস মাড়ায়। তখন পটোম্যাকের স্রোত আর সময় দ্রুত গড়াতে থাকে।
দৈনিক আশি ডলারের পারডিয়ামটা জুত করে মানিব্যাগে ভরে আমি প্রতিদিন অরলির পার্স খালি করতে থাকি। কিংবা বলা যায়, আমার জীবন বদলানোর দায়িত্ব স্বেচ্ছায় স্কন্ধে তুলে নেয়ায় সর্বত্র নিজেই সে আগেভাগে বিল চুকোতে থাকে। কয়েকদিনের মধ্যে ওর বিলে দেয়াই স্বাভাবিক হয়ে দাঁড়ায়। কোন ইনফিউরিরিটি কাজ করে না আমার ।
সার্টিফিকেটটা হাতে পেতে খুব বেশি বিলম্ব হয় না। জীবনবদলের ঘোরলাগা সকাল-সন্ধ্যা টুটিয়ে দিই। বহু বহু বছরের আগামীকে মুহূর্তে সামনে জড়ো করে দেখি উল্টেপাল্টে। একসন্ধ্যায় পরিকল্পনা পোক্ত করে ফেলি। অরলি তখনও ঘোরে। জীবনবদলের আগে বদলে যায় আমার ফ্লাইট । ওয়াশিংটন টু ঢাকা।

(ছবিটা গাঁজা না, আসল। ওয়াশিংটন, আগস্ট-২০০০ )

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close