ফেসবুক থেকে

গান-গরিমার ফেরদৌসী ২৮ জুন প্রিয়দিন জন্মদিনে স্মৃতিগদ্য, প্রীতিপদ্য

সালেম সুলেরী
অমর গায়ক আব্বাসউদ্দিনের কৃতী কন্যা তিনি। বাবার জন্ম ২৭ অক্টোবর, ১৯০১, দেহাবসান ৩০ ডিসেম্বর ১৯৫৯। মা লুৎফুন্নেসা আব্বাস কবি, সমাজসেবিকা। সন্তানদের লালন-পালনের জন্যে গান ছেড়ে দেন। বড়ো সন্তান সাবেক প্রধান বিচারপতি মোস্তফা কামাল প্রয়াত। অপর সন্তান মুস্তাফা জামান আব্বাসী প্রখ্যাত কন্ঠশিল্পী, লেখক। পুত্রবধুদ্বয় হোসনে আরা কামাল, আসমা আব্বাসীও লেখক। উত্তরসুরী ড. নাশিদ কামাল, সামিরা আব্বাসী, আরমিন– কন্ঠশিল্পী। ফেরদৌসী রহমানের স্বামী প্রকৌশলী রেজাউর রহমান। বড়োছেলে রুবাইয়াত রহমান, এমবিএ অ্যামেরিকা প্রবাসী। অপরজন প্রকৌশলী রাজিন রহমান বৃটেন-বাংলাদেশে বসবাসরত। ‘এসো গান শিখি’– টিভির সর্বদীর্ঘ গানের অনুষ্ঠান। খালামনি-খ্যাত ফেরদৌসী রহমান সফল পরিচালক। তাতে একদা ‘মিঠু-মন্টি’ হতো সন্তান– রুবাইয়াত, রাজিন।

প্রিয়-শ্রদ্ধেয় ফেরদৌসী আপার জীবনপন্জি অনেক দীর্ঘ। কবিতায় তার সামান্য আলো ফেলতে পেরেছি। উনি ইতোপূর্বে পদ্যটি পড়ে বিমোহিত বলে জানান। সর্বশেষ সাক্ষাৎ ‘মেরিল প্রথম আলো’র অনুষ্ঠান উপলক্ষে। ঢাকায় উনি সেবছর ‘আজীবন সম্মাননা’ পেয়েছিলেন। তুলে দেন ‘বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র’-খ্যাত অধ্যাপক আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ। সম্পাদক মতিউর রহমানসহ গণ্যমান্য সংস্কৃতিসেবীরা ছিলেন। আমি ঢাকায় থাকলে ফেরদৌসী আপার ডাক পাই। যেখানে অনুষ্ঠান-আয়োজন থাকে– নেয়ার চেষ্টা করেন। সেবার ভাজতি নাশিদ কামাল আর আমি সঙ্গ দিয়েছিলাম। এরপর প্রবাস থাকায় দীর্ঘদিন আর নৈকট্য পাইনি।

ফেরদৌসী আপার গুণবতী জননী আমার বড়ো ফুপু। ঢাকার জীবনে ফুপু’আম্মাই ছিলেন আমাদের প্রধান অভিভাবক। নিজে কবিতা-স্মৃতিকথা লিখতেন, আমাকেও সমাদর করতেন। তিনি দেহ ত্যাগ করলেন ২০০৩-এর ১১ মার্চে। বিশাল শোকসভা, মিলাদ হলো পৈতৃকবাসে। বৃহত্তর রংপুরের নীলফামারী জেলার ডোমারে। ফেরদৌসী আপাসহ ১১ঘন্টায় সড়কপথে গেলাম গ্রামবাড়ি। সঙ্গে আরেক ফুপাতো বোন সুদর্শনা গিনি আপা। ওনার ছেলে বাবুন-এর স্ত্রী গায়িকা সাবাতানি, প্রয়াত।

সেই মায়াবী ভ্রমণটি ফেরদৌসী আপার কারণে বাঙময়। আমার আব্বা সরকার এম সোলায়মান ওনার ‘মামুজান’। বেঁচে থাকা একমাত্র মামা, ‘মামুবাড়ি’ আগেও এসেছেন। আমার আম্মাও ওনার সবচে প্রিয় মামী ছিলেন। কিন্তু সেই প্রিয় মানুষটি ক্যান্সারে প্রয়াত হন ১৯৯৮-এ। সেবার নাম ধরে ধরে নিকটজনদের খবর নিলেন ফেরদৌসী আপা। রংপুরের আন্চলিক ভাষায় সবার সাথে মেতে উঠেছিলেন। ওনাকে দেখার জন্যে পাড়া ভেঙে মানুষ এসেছিলো। আমাদের বাড়িতেই উঠলেন, থাকলেন চারদিন। ওনার বড়ো সহোদর বিচারপতি মোস্তফা কামালও আসেন। ফেরদৌসী আপার পারিবারিক নাম ‘মীর্ণা’। বিচারপতি কামালের ডাক নাম ‘দুলু’। সেই দুলু ভাই-এর জন্ম আমাদের পুরোন বাড়িতে। মুরুব্বিরা আদরের দুলু, মির্ণাকে পেয়ে মহাখুশি। উল্লেখ্য, তুলু মানে মুস্তাফা জামান আব্বাসী এসেছিলেন পরবর্তী আয়োজনে।

চিকনমাটি গ্রামে মিলাদ, নাট্যসমিতি মিলনায়তনে শোকসভা। মুখ্য আয়োজক কাজল, বজু, সিদ্দিক, ইলিয়াস, মোস্তফা, খালিদ প্রমুখ। সঙ্গে আব্বাসউদীন একাডেমি, ডোমার। অসংখ্য শিশু-কিশোর এসেছিলো ‘এসো গান শিখি’র খালামনি সকাশে। ফেরদৌসী আপা রোদন-চাপানো হৃদয়স্পর্শী বক্তব্য দেন। বলেন, আজকে গান নয়, শুধু মায়ের জন্যে ভালোবাসা। সবাই নিজ নিজ মা’কে ভালোবাসবো, প্রতিজ্ঞা করবো। মায়ের আত্মা বা হৃদয় তৃপ্ত থাকলেই আমাদের জন্ম সার্থক। ♠ ২৮ জুন ফেরদৌসী আপার প্রিয়দিন– জন্মদিন।

♥গান-গরিমার ফেরদৌসী ♣ সালেম সুলেরী

গান-গরিমার ফেরদৌসী– সুর সাগরের ঢেউ,
পদ্মা নদীর ঢেউ-গীতিটা আর পারেনি কেউ।
শুন্য হৃদয় পূর্ণ করা, বন্ধু-বাতাস বইবে,
কথা বলুক, নাইবা বলুক– ছায়া হয়েই রইবে।
রূপ-নগরের রূপের রাণী, সুরের জাদু আনে,
সুখের জাদু দেশ-পরিবার, প্রবাসী সন্তানে…।
বাবা গায়ক, ভ্রাতাও গায়ক, মায়ের ছিলো সখ-
গায়কী তার মেয়ে’কে দিয়ে হয়েছে লেখক!
সেই মেয়েটি কিশোর বেলায় তালিম নিলো ঢের,
উচ্চারণে, ব্যাকরণে রেওয়াজী কন্ঠের।

উত্তরে যে বঙ্গ আছে, ভাওয়াইয়াতে লীন,
সেই মাটিতেই আঠাশ জুনে জ্যোতির জন্মদিন।
সত্যিকারের জ্যোতির্ময়ী, মীর্ণা নামে ডাকে,
সেই কিশোরী গানের ধ্যানে– বিদ্যাপীঠের ফা’কে
প্রবেশিকা’য় প্রথম হলো, নারীর মাঝে গুরু
বঙ্গটিভির শিল্পী প্রথম, তা’কে দিয়েই শুরু।
তাঁকে দিয়েই অনেক কিছু, ঢাবি’র বিদ্যাপীঠ-
সমাজবিদ্যা, সোসিওলজী, বিভাগ শুরু, লীড…।
রেডিওতে, সিনেমাতে বঙ্গ এগোয়, ভাসে,
ফেরদৌসীর গান-গরিমা শুরুর ইতিহাসে।
সু-সিনেমায় গানের ডালি– পরিচালক সুরের,
নিয়ন-নারী– প্রথম তিনি পথ খুলেছেন দূরের।

শুনতে যেমন, দেখতে তেমন, সুদর্শনা, সাব্বাস,
গান-গরিমার নেপথ্যে তার মহান বাবা আব্বাস।
‘রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ,
বাবাই ছিলো সূচক গায়ক, বাবাই গড়ান ভিত!
এক দিনে নয়, দুই দুই দিনে নয়, লক্ষ দিনের শ্রমে,
ফেরদৌসীর ঢের ভূমিকা, গান ছড়ালো ক্রমে।
গান শিখি হে এসো এসো, কন্ঠ-ক্লাশের ধ্বনি,
একশ কোটি প্রজন্মমুখ ডাকছে– ‘খালামণি!’
আর গাড়িয়াল ভাই’রা ডাকে, হাঁকাও গাড়ি বলে,
এক জীবনে এক চেহারার হাসিতে, সম্বলে-
বুক ভরা তার তারুণ্য আর সুর ভরা তার কথা,
রাঁধন-বাড়ন, সমাজসেবা, ধর্মে যথার্থতা।

বয়েস ভারে হন নি কাবু, গেলেন বহুত দূর,
বিশ্বসালাম, শুভাশিসও– সুরের সমুদ্দুর!
দিন-প্রিয়দিন জন্মদিনে সপরিবার দোয়া–
ফেরদৌসী’র ফুলেল আয়ু– শতবর্ষ ছোঁয়া..!

♦ছন্দ : স্বরবৃত্ত সংশোধন নিউইয়র্ক

আরও পড়ুন

Back to top button
Close
Close